রাজনীতিতে কোনো যতিচিহ্ন নেই। যে পরিস্থিতি আজ অসম্ভব বা নিবু নিবু মনে হচ্ছে, অদূর ভবিষ্যতে তা দাবানলের রূপ নিতে পারে। যে রাজনৈতিক দল বা নেতাকে আজ শেষ বলে মনে হচ্ছে, তারাও ফিনিক্স পাখির মতো ধ্বংসস্তূপ থেকে জেগে উঠতে পারেন। গত ১৮ মার্চ রাজ্যসভার ৫৯ জন সদস্যের মেয়াদ শেষ হওয়ার দিনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই চিরন্তন সত্যটি মনে করিয়ে দিয়েছিলেন। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে, এনসিপি নেতা শারদ পাওয়ার এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী এইচ ডি দেবগৌড়াসহ অনেক রাজনীতিকের উপস্থিতিতে তিনি বলেছিলেন, রাজনীতিতে যতিচিহ্ন বলে কিছু নেই। যে দল বা নেতার হাল দেখে মনে হচ্ছে জনজীবনে দেওয়ার মতো আর কিছুই অবশিষ্ট নেই; একদিন দেখা যেতে পারে ফিনিক্স পাখির মতো ধ্বংসস্তূপ থেকে মাথা তুলে তিনি আবার ডানা ঝাপটাচ্ছেন।
এই মুহূর্তের পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে মমতার অবস্থাকে অনেকে রাজনৈতিক ‘গোধূলিবেলা’ হিসেবে দেখছেন। রাজ্যে প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় আসা বিজেপি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে চূড়ান্তভাবে কোণঠাসা করার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে। বর্তমানে ‘তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম এবং ‘জোড়া ঘাসফুল’ প্রতীক ব্যবহার করার আইনি বৈধতা মমতা ও তাঁর দলত্যাগী বিক্ষুব্ধ নেতাদের হাতছাড়া হয়েছে। আগামী ৬ অক্টোবর নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরে যে উপনির্বাচন হতে চলেছে, সেখানে কোনো পক্ষই এই নাম ও প্রতীক ব্যবহার করতে পারবে না। তৃণমূল কংগ্রেসকে দুরমুশ করে এই বছরের মে মাসে যারা প্রথমবারের মতো পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এসেছে, সেই বিজেপির রাজ্য–নেতৃত্ব অবশ্য সদর্পে ঘোষণা করেছেন, মমতাকে তাঁরা শেষ করে ছাড়বেন।
নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তে সৃষ্ট এই সংকটে মমতা এখন বিরোধী শিবিরে একপ্রকার ‘সর্বহারা’ অবস্থানে দাঁড়িয়েছেন। নিজের হাতে গড়া দল ও প্রতীকের বাইরে গিয়ে এখন তাঁকে কংগ্রেসের শরণাপন্ন হতে হচ্ছে। বিজেপির হিন্দুত্ববাদ মোকাবিলায় অতীতে কংগ্রেস বা রাহুল গান্ধীর প্রতি মমতার অবজ্ঞা ও জোটবিরোধী অবস্থান আজ তাঁর বিরুদ্ধেই দাঁড়িয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, পাঁচ মাস আগে যদি তিনি সব বিরোধী শক্তিকে নিয়ে জোটবদ্ধ হতেন, তবে আজকের এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না। বিজেপির হিন্দুত্ববাদ মোকাবিলায় মমতা কোথায় ভুল করলেন। কিছুকাল আগেও যিনি রাহুল গান্ধীকে বিরোধী জোটের নেতা মানতে চাননি, পদে পদে অসম্মান করেছেন, জোটের মধ্যে জোট তৈরি করে পরোক্ষভাবে বিজেপিকে সাহায্য করেছেন; নখদন্তহীন বৃদ্ধ সিংহের মতো সেই মমতা আজ কংগ্রেসের শরণাপন্ন। সর্বভারতীয় স্তরে তো বটেই, রাজ্য-রাজনীতিতেও তিনি বিজেপিবিরোধী শক্তিদের জোটবদ্ধ হওয়ার হাঁক দিচ্ছেন।
পশ্চিমবঙ্গের বিগত বিধানসভা নির্বাচনের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তৃণমূল কংগ্রেসের ভোট ৪১ শতাংশের নিচে নামানো সম্ভব হয়নি। নির্বাচন কমিশনের এসআইআর প্রক্রিয়াকে সাবেক মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এস ওয়াই কুরেশি ‘১০০ শতাংশ স্ক্যাম’ বা প্রতারণা হিসেবে অভিহিত করেছেন। নির্বাচনে প্রায় এক কোটি ভোটারের তালিকা সংশোধন, ২৭ লাখ ভোটারকে ট্রাইব্যুনালে পাঠানো, সাড়ে ৭০০ কর্মকর্তাকে ক্ষমতাহীন করা এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীর ব্যাপক ব্যবহার সত্ত্বেও বিজেপি ৪৫ শতাংশের বেশি ভোট পায়নি। তৃণমূলের দাবি, গণনার দিন এজেন্টদের বের করে দিয়েই মূলত এই ব্যবধান তৈরি করা হয়েছে। ফলে ৭০ শতাংশ মুসলমান এলাকায় বিজেপি জেতে কি না, সেটাই আপাতত মূল আকর্ষণ।
পরিসংখ্যান বলছে, এবারের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি ৪৬ দশমিক ২৫ শতাংশ ভোট পেয়েছে, যা দুই বছর আগের লোকসভা নির্বাচনের তুলনায় প্রায় ৭ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেস পেয়েছে ৪১ দশমিক ১৬ শতাংশ, কংগ্রেস ২ দশমিক ৯৯ শতাংশ এবং সিপিএম ৪ দশমিক ৪৯ শতাংশ ভোট। বামপন্থী অন্যান্য দলের প্রাপ্ত ভোট যোগ করলে বিজেপিবিরোধী শক্তির সম্মিলিত ভোট প্রায় ৫০ দশমিক ৭২ শতাংশে দাঁড়ায়। মমতা আন্তরিকভাবে সচেষ্ট হলে এই ভোট ভাগাভাগি রোধ করে বিজেপির জয় আটকানো সম্ভব ছিল বলে অনেকে মনে করেন।
রাজনৈতিক জীবনে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে মমতার কিছুটা মিল থাকলেও পার্থক্যের জায়গাটিও বড়। পুত্র সঞ্জয় গান্ধীর কারণে ইন্দিরা যেমন সমালোচিত হয়েছিলেন, তেমনি মমতার ক্ষেত্রেও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে রয়েছে বিতর্ক। তবে इंदिरा যখন কংগ্রেসি নেতাদের মোকাবিলা করেন, তখন তাঁর বয়স ছিল ৫০। অন্যদিকে মমতা নিঃশেষ হওয়ার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন ৭১ বছর বয়সে। ৭৫ বছর বয়সে জয়প্রকাশ নারায়ণ যখন ইন্দিরাকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিলেন, তখন পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। মমতার অবশিষ্ট রাজনৈতিক শক্তিতে তিনি কি ফের ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন, নাকি কংগ্রেসের আড়ালে বিলীন হয়ে যাবেন—সেই প্রশ্ন এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।
বর্তমানে তৃণমূল কংগ্রেসের অনেক নেতা মমতা ছেড়ে চলে গেছেন। কংগ্রেসের ভেতরেও মমতাকে দলে নেওয়ার বিষয়ে দ্বিধা রয়েছে; অনেকের মতে, তাঁকে গ্রহণ করা মানে তাঁর অতীতের সব কর্মকাণ্ডের দায়ভার নেওয়া। এর বদলে রাজ্যে বিকল্প শক্তিশালী ভিত্তি গড়ে তোলার দিকেই বেশি আগ্রহী কংগ্রেস। তবে এটা নিশ্চিত যে, বিরোধী জোটের সঙ্গী হওয়া ছাড়া মমতার সামনে এখন বিকল্প পথ খুবই সীমিত।
শুভেন্দু অধিকারীর কৌশলে নন্দীগ্রামে মমতার প্রার্থী এখন কোণঠাসা। রেজিনগরের প্রার্থীও রাষ্ট্রীয় চাপে প্রচারে থাকতে পারছেন না। সব মিলিয়ে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কি মায়াবতীর মতো অপাঙ্ক্তেয় হয়ে পড়বেন, নাকি আবারও রাজনৈতিক খেলায় ফিরবেন—তা সময়ই বলে দেবে। এখনো পরাজয় স্বীকার না করা মমতা অভিষেককে আড়াল করে রাজনীতিতে টিকে থাকার শেষ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। মমতা বনাম মমতাত্যাগী তৃণমূলিদের সম্ভাব্য নির্বাচনী টক্কর ঘিরে উত্তেজনার যে ফানুস উড়ছিল, গুরুমারা বিদ্যা প্রয়োগে তাতে সুচ ফুটিয়েছেন শুভেন্দু। রেজিনগরের প্রার্থী টলমল করতে করতে টিকে আছেন ঠিকই কিন্তু রাষ্ট্রীয় চাপ সহ্য করতে না পেরে প্রচার থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সেখানকার মূল শক্তি আমজনতা উন্নয়ন পার্টির হুমায়ুন কবির, যিনি এই আসন ছেড়ে দেওয়ায় উপনির্বাচন।





