চীন ও বাংলাদেশের মধ্যকার কৌশলগত সম্পর্ক এবং ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতাকে ভারত তার জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করছে। ভারতীয় সামরিক কর্মকর্তা, কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা দীর্ঘদিন ধরেই এই সম্পর্ক নিয়ে নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করে আসছেন। বিশেষ করে তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা ও মংলা বন্দর প্রকল্প নিয়ে চীনের সম্পৃক্ততাকে ভারতীয় বিশেষজ্ঞরা ‘নিরাপত্তা সীমারেখা’ বা ‘রেড লাইন’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাদের মতে, শিলিগুড়ি করিডোর বা ‘চিকেন’স নেক’ থেকে মাত্র ২২ কিলোমিটার দূরে চীনা কোম্পানি ‘পাওয়ার চীন’-এর উপস্থিতি ভারতের জন্য বড় ধরনের হুমকি। ইতোমধ্যে ৫০ জন চীনা প্রকৌশলী ও কারিগরি বিশেষজ্ঞের একটি দল সমীক্ষার কাজে বাংলাদেশে পৌঁছেছে।
ভারতের সাবেক হাইকমিশনার বীণা সিক্রি দাবি করেছেন যে, শেখ হাসিনা সরকারের ওপর চীন এই প্রকল্পে যুক্ত হওয়ার জন্য দীর্ঘসময় চাপ সৃষ্টি করেছিল। তার মতে, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ভারতের উদ্বেগকে গুরুত্ব দিচ্ছে না। তিনি শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দরের উদাহরণ টেনে সতর্ক করেছেন যে, ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে চীন দীর্ঘমেয়াদে এই প্রকল্পের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে। এছাড়া বাংলাদেশ চীনের কাছ থেকে ২০টি জে-১০ সি যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে আলোচনা করছে। চীন কক্সবাজারে একটি সাবমেরিন ঘাঁটি তৈরি করছে এবং লালমনিরহাট এয়ারবেসের অবকাঠামো উন্নয়নে সহায়তা দিচ্ছে, যা ভারতের নিরাপত্তার জন্য চিরস্থায়ী উদ্বেগ। ভারতীয় প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ মেজর জেনারেল (অব:) সঞ্জয় সোয়েনের মতে, বাংলাদেশ এখন পাকিস্তানের পর চীনা অস্ত্রের দ্বিতীয় বৃহত্তম ক্রেতা এবং এই ক্রমবর্ধমান পদচিহ্ন ভারতের জন্য উদ্বেগের কারণ।
তক্ষশীলা ইনস্টিটিউশনের বিশ্লেষক আনুষ্কা স্যাক্সেনা মনে করেন, চীনের যেকোনো জ্বালানি বা পরিবেশগত প্রকল্পকে ভারতের বিরুদ্ধে একটি ‘প্রক্সি’ লড়াই হিসেবে দেখা উচিত। তিস্তা প্রকল্পের সমীক্ষার নামে সংগৃহীত তথ্য ভবিষ্যতে সামরিক অভিযানে ব্যবহৃত হতে পারে বলে তিনি শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। অন্যদিকে, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ভারত কর্তৃক দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপ দখল এবং নদীর গতিপথ পরিবর্তনের মতো ঐতিহাসিক বিষয়গুলো নিয়ে সমালোচনার অবকাশ রয়েছে। ভারত কর্তৃক ফারাক্কা ও গজলডোবার মতো বাঁধের কারণে বাংলাদেশে মরুভূমিময় পরিবেশ ও কর্মসংস্থান সংকটের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড় থেকে ১৯৮৪ সালের বন্যা পর্যন্ত প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাংলাদেশের ৮০০ থেকে ১০০০ কিলোমিটার উপকূলীয় এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যেখানে ১.২ বিলিয়ন ডলারের বেশি অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ২০২৪ ও ২০২৫ সালের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ এখন বিশ্বরাজনীতির প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের ওপর একক নির্ভরতা কমিয়ে চীনসহ অন্যান্য পরাশক্তির সাথে কৌশলগত সম্পর্ক জোরদার করছে। ঢাকা এখন ভারতের সাথে সমমর্যাদায় ও প্রয়োজনে কড়া জবাব দেওয়ার নীতি গ্রহণ করেছে, যা ভারতের একাধিপত্যের রাজনীতিকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।





