১৯ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গানের ভুবনে অনন্য অনুভূতির নাম এন্ড্রু কিশোর

প্রকাশ:

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক গায়ক হিসেবে এন্ড্রু কিশোর ছিলেন এক অপরিহার্য নাম। যেকোনো ঘরানার গান নিজের কণ্ঠে দারুণভাবে ফুটিয়ে তোলার এক অদ্ভুত ক্ষমতা ছিল তাঁর। রোমান্টিক, মেলোডিয়াস, বিরহ, ফোক কিংবা চটুল—সংগীতের সব ধরনের ধারায় তিনি সমান স্বাচ্ছন্দ্যে বিচরণ করেছেন। বহু কালজয়ী গানের এই মহান শিল্পী ২০২০ সালের ৬ জুলাই না-ফেরার দেশে পাড়ি জমান। শুধু এটা নয়, গানের জন্য বাসা থেকে অসময়ে বেরিয়ে যাওয়া বা না থাকার ঘটনা জীবনে অনেকবার হয়েছে।

এন্ড্রু কিশোর কুমার বাড়ৈ ১৯৫৫ সালের ৪ নভেম্বর রাজশাহীতে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর মা ছিলেন গানপাগল মানুষ এবং কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী কিশোর কুমারের ভীষণ ভক্ত। মায়ের সেই অনুরাগের কারণেই ছেলের নাম রাখা হয়েছিল ‘কিশোর’। পারিবারিক এই ভালোবাসার সূত্র ধরেই সংগীতে তাঁর আনুষ্ঠানিক পথচলা শুরু হয়। রাজশাহীতে বেড়ে ওঠা এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা শেষ করে তিনি দেশের সংগীতজগতে নিজের স্থায়ী আসন গড়ে তোলেন।

সংগীত অঙ্গনে এন্ড্রু কিশোর সর্বজনীনভাবে ‘প্লেব্যাক সম্রাট’ হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছিলেন। বাংলাদেশ ছাড়াও পশ্চিমবঙ্গসহ পুরো বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলে চলচ্চিত্র ও আধুনিক গানের ক্ষেত্রে তাঁর নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়। সেলুলয়েডের দৃশ্য বা গল্পের আবেগ অনুযায়ী সুখ-দুঃখ, হাসি-আনন্দ ও প্রেম-বিরহের অনুভূতির গান তাঁর গায়কিতে নিখুঁত রূপ পেত। জীবনের শেষ দিনগুলো পার করে তিনি আবার নিজের প্রিয় জন্মভূমি রাজশাহীতেই ফিরে যান এবং সেখানেই চিরনিদ্রায় শায়িত হন। তাঁকে প্লেব্যাক সম্রাট হিসেবে পরিচিত বলতে কেউ কার্পণ্য করেননি।

গানের প্রতি পেশাদার নিষ্ঠা থাকলেও ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনকে সংগীতের দুনিয়া থেকে আলাদা রাখতেন তিনি। কাজের ব্যস্ততায় বিভিন্ন বিশেষ দিনেও পরিবারের পাশে থাকতে না পারার স্মৃতি রয়েছে তাঁর। ছেলের প্রথম জন্মদিনে তিনি অবস্থান করছিলেন আমেরিকায়, আর দ্বিতীয় জন্মদিনের সময় তাঁকে থাকতে হয়েছিল রেকর্ডিং স্টুডিওতে। এমনকি বিয়ের পরদিন সকালেও তিনি সরাসরি স্টুডিওতে কাজ করতে ছুটে গিয়েছিলেন। তবে সংসার দেখভালের মূল দায়িত্ব তাঁর স্ত্রী নিপুণভাবে সামলাতেন। জন্মদিনে পুরোনো দিনের কথায় স্মরণ করি তাঁকে। অবশ্য সংসার দেখভালের কাজটি মূলত তাঁর স্ত্রীই করতেন।

রাজনীতি, সামাজিক সংগঠন বা সভা-সমাবেশে খুব একটা দেখা মিলত না এই শিল্পীর। নিজের জীবনভাবনা নিয়ে এক সাক্ষাৎকারে তিনি উল্লেখ করেছিলেন, জীবনকে সব সময় খুব কাছ থেকে ও সূক্ষ্মভাবে দেখার চেষ্টা করেন তিনি। নিজের চিন্তা স্ত্রী, সন্তান আর ঘরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে পছন্দ করতেন এবং এ বিষয়ে নিজেকে কিছুটা স্বার্থপর মনে করলেও নিজের মতো করেই সুখী থাকতে ভালোবাসতেন। একটা জীবন কাটিয়ে গেলেন শুধু গানে গানে। বউ, বাচ্চা আর ঘরেই সীমাবদ্ধ আমার চিন্তা।

গানের ক্ষেত্রে শতভাগ পেশাদার মনোভাব বজায় রাখলেও সমসাময়িক অনেকের মতো নিজে সুর করা বা গান লেখার দিকে ঝোঁকেননি এন্ড্রু কিশোর। এ প্রসঙ্গে তিনি নিজেই সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, নিজেকে খুব বেশি প্রতিভাবান বলে মনে করেন না এবং সুর বা কথার চেয়ে গায়কিটাকেই তিনি নিজের মূল ক্ষেত্র হিসেবে দেখেন। অ্যালবামে সব শ্রেণির শ্রোতার কাছে পৌঁছাতে বিভিন্ন গীতিকার ও সুরকারের কাজ থাকা উচিত বলেও তিনি বিশ্বাস করতেন।

১৯৭৭ সালে আলম খানের সুর করা ‘মেইল ট্রেন’ ছবির ‘অচিনপুরের রাজকুমারী নেই’ গানের মাধ্যমে চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক শুরু করেন এন্ড্রু কিশোর। তবে দুই বছর পর ‘ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে’ গানটির মাধ্যমে তিনি দেশজুড়ে ব্যাপক পরিচিতি ও ভালোবাসা পান। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে প্রায় ১৫ হাজার গানে কণ্ঠ দেওয়া এই অসামান্য শিল্পী মোট আটবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।

চলচ্চিত্রের বাইরে ‘ইত্যাদি’ অনুষ্ঠানে তাঁর গাওয়া ‘পদ্মপাতার পানি নয়’ গানটি শ্রোতাদের মাঝে বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করে। অডিও বাজারের চেয়ে চলচ্চিত্রে গানেই তিনি বেশি মনোযোগী ছিলেন। ‘হায়রে মানুষ, রঙিন ফানুস দম ফুরাইলেই ঠুস’-এর মতো অসংখ্য কালজয়ী গান রেখে তিনি বিদায় নিলেও, তাঁর সুর ও গায়কি চিরদিন সংগীতপ্রেমীদের হৃদয়ে টিকে থাকবে। যেন মানুষটার জন্মই হয়েছিল গানের জন্য, অসংখ্য গানের সৃষ্টি হয়েছিল যেন তারই জন্য।

শেয়ার করুন