১৭ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

উখিয়ায় জ্বলছে গ্যাসের আগুন, ১৫ দিন পর্যবেক্ষণের সিদ্ধান্ত বাপেক্সের

প্রকাশ:

কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে গত পাঁচ দিন ধরে মাটির নিচ থেকে বেরিয়ে আসা গ্যাসের আগুনে জ্বলছে। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ ও নমুনা পরীক্ষায় বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, গ্যাসের পাশাপাশি এখানে জ্বালানি তেল বা কনডেনসেট থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলা ও মাটির নিচের মজুত সম্পর্কে নিশ্চিত হতে বাপেক্স ও পেট্রোবাংলা এলাকাটিকে আগামী ১৫ দিন নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যদি আগুনের তীব্রতা না কমে, তবে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে একটি ‘রিলিফ কূপ’ খনন করা হতে পারে বলে জানানো হয়েছে। তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি বাড়ছে দুর্ঘটনার শঙ্কাও। গত শুক্রবার সন্ধ্যায় ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে রিলিফ কূপ খননের ঘোষণা দেন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স) এবং বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) উচ্চ পর্যায়ের একটি দল। তবে এক্ষেত্রে নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। এদিকে আগুনের এমন পরিস্থিতিতে এলাকাবাসীর মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। যানবাহন নিয়ে চলাচলেও ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

গত বৃহস্পতিবার পেট্রোবাংলায় বাপেক্স ও পেট্রোবাংলার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের পাশাপাশি অবসরপ্রাপ্ত মহাব্যবস্থাপকদের নিয়ে একটি জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভার তথ্য অনুযায়ী, নির্গত গ্যাস থার্মোজেনিক ও বায়োজেনিক উভয় প্রকৃতির হতে পারে। পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন ও মাইনস) প্রকৌশলী শোয়েব জানান, মাটির নিচের শ্যালো রিজার্ভার বা অগভীর মজুত থেকে এই গ্যাসের নিঃসরণ ঘটছে। সাধারণত দেশে দেড় থেকে পাঁচ কিলোমিটার গভীরতায় গ্যাসের স্তর পাওয়া গেলেও এটি অগভীর হওয়ায় নিবিড় পর্যবেক্ষণ জরুরি হয়ে পড়েছে।

বাপেক্সের ভূতাত্ত্বিক বিভাগের মহাব্যবস্থাপক শামসিয়া মুকতাদির বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বাপেক্সের প্রয়োজনীয় সক্ষমতা ও পূর্ব অভিজ্ঞতা রয়েছে।

পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য কারিগরি দল কাজ করছে।

১৫ দিন পর আগুনের শিখার উচ্চতা ও গ্যাস নির্গমনের মাত্রা বিশ্লেষণ করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

প্রবাহ না কমলে সাইড ট্র্যাকিং প্রযুক্তির মাধ্যমে রিলিফ কূপ খনন করে গ্যাস নিঃসরণ বন্ধ করার পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া এলাকাটির ভূতাত্ত্বিক গঠন বুঝতে বাপেক্স ত্রিমাত্রিক (থ্রিডি) ভূকম্পন জরিপ পরিচালনা করবে। অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক মজুত নিশ্চিত হলে নতুন কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হবে। ইনানীর এই উৎস থেকে জ্বালানি পাওয়া গেলে এটি হবে দেশের ৩১তম খনিজ কূপ। মো. শোয়েবের মতে, আশপাশের কয়েকটি ভূতাত্ত্বিক স্তর থেকেও গ্যাস জ্বলতে দেখা গেছে।

গত ২৭ অক্টোবর সকালে ইনানী ছোট খাল ব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় নলকূপ স্থাপনের সময় প্রায় এক হাজার ফুট গভীরে পাইপ যাওয়ার পরই গ্যাস বের হতে শুরু করে এবং দ্রুতই তাতে আগুন ধরে যায়। এ ঘটনায় বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে গত বৃহস্পতিবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে জরুরি বৈঠক হয়। এরপর উখিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পান্না আক্তার ঘটনাস্থলের ২০০ মিটারের মধ্যে সাধারণ মানুষের প্রবেশ ও অবস্থান নিষিদ্ধ করে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৪ ধারা জারি করেছেন। তারা ইতোমধ্যে নানা ধরনের নমুনা সংগ্রহ করেছেন এবং তা পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে। জানা গেছে, গত ২৭ অক্টোবর সকালে উখিয়ার জালিয়াপালং ইউনিয়নের ছয় নম্বর ওয়ার্ডের ইনানী ছোট খাল ব্রিজসংলগ্ন একটি বাড়িতে নলকূপ স্থাপনের কাজ চলছিল। পরে উপজেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে ফায়ার সার্ভিসের কয়েকটি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালায়। এভাবে চলতে থাকলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

প্রশাসনের জারি করা আদেশে ওই এলাকায় আগুন জ্বালানো, ধূমপান, দিয়াশলাই বা লাইটার ব্যবহারসহ স্ফুলিঙ্গ সৃষ্টি করতে পারে এমন যেকোনো কার্যক্রম কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নির্দেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিতে ঘটনাস্থলে কাঁটাতারের বেড়া ও সতর্কতামূলক লাল পতাকা স্থাপন করা হয়েছে এবং এলাকায় মাইকিং করা হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে।

স্থানীয় বাসিন্দারা উদ্বেগ জানিয়ে বলছেন, ১৪৪ ধারা জারি থাকলেও বিকেলের দিকে উৎসুক জনতার ভিড় বাড়ছে, যা পরিস্থিতিকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। বাসিন্দা ছৈয়দ আলম জানান, প্রাথমিকভাবে ৭২ ঘণ্টার কথা বলা হলেও আগুনের তীব্রতা দিন দিন বাড়ছে। আরেক বাসিন্দা বেলাল উদ্দিন ও শহিদুল আলমের ভাষ্যমতে, আগুনের কারণে ওই এলাকায় চলাচল ব্যাহত হচ্ছে এবং প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও উৎসুক লোকজনের ভিড় নিয়ন্ত্রণ করা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, ১৪৪ ধারা জারির পরও প্রতিদিনই বিকালে ঘটনাস্থলে মানুষের ভিড় বেড়ে যাচ্ছে। শহিদুল আলম নামের এক ব্যক্তি বলেন, ঘটনার তিন দিন পর প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করেছে। ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীকে পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। কিন্তু তা অমান্য করেই উৎসুক লোকজন ঘটনাস্থলের আশপাশে ভিড় করছেন।

শেয়ার করুন