১৩ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জাপানে ৬.৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের নতুন সম্ভাবনা

প্রকাশ:

জাপান সফরের দ্বিতীয় দিনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশটির প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে টোকিওতে তার কার্যালয় ‘কান্তেই’-তে এক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হন। দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে তারা ‘কৌশলগত অংশীদারিত্বে’ উন্নীত করার বিষয়ে একমত হয়েছেন। এই সফরের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতির নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে বলে উভয় পক্ষ আশাবাদ ব্যক্ত করে। দুই দেশের আলোচনার ফলাফল ও অভিন্ন অগ্রাধিকারগুলো একটি যৌথ বিবৃতিতে তুলে ধরা হবে।

বৈঠকের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো বাংলাদেশের জ্বালানি, অবকাঠামো এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) খাতে ১ ট্রিলিয়ন জাপানি ইয়েন বা প্রায় ৬.৩ বিলিয়ন ডলার বেসরকারি বিনিয়োগের সম্ভাবনা। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশ-জাপান টেক পার্ক প্রতিষ্ঠা, ছয়টি বিভাগীয় শহরকে ঘিরে দ্রুতগতির রেল নেটওয়ার্ক এবং দেশব্যাপী উড়াল সড়ক নির্মাণের প্রস্তাব তুলে ধরেন। নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও আধুনিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে জাপানি সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্ব পায়। এ লক্ষ্য অর্জনে জাপানি বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের সুযোগ অনুসন্ধানের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। বাংলাদেশে বিদ্যমান বিনিয়োগের সুযোগগুলো অনুসন্ধান করতে এবং আমাদের উন্নয়নের পরবর্তী ধাপে অংশীদার হতে আমি জাপানি বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আন্তরিকভাবে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। তিনি বলেন, উৎপাদনশীল বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পারস্পরিকভাবে লাভজনক ব্যবসায়িক উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে তার সরকার জাপানি অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে জাপান বাংলাদেশের অন্যতম মূল্যবান উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে আর্থ-সামাজিক অগ্রগতি ও অবকাঠামো উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে।

দুই নেতার উপস্থিতিতে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি হস্তান্তরবিষয়ক একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি সই হয়। এছাড়া বাংলাদেশের উপকূলীয় নিরাপত্তা সক্ষমতা বাড়াতে জাপানের সরকারি উন্নয়ন সহায়তার অধীনে একটি টহলজাহাজ দেওয়ার ঘোষণাও এসেছে। ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার করার পাশাপাশি উভয় দেশ তাদের সক্ষমতা ও স্থিতিশীলতা বাড়াতে ‘বিগ-বি’ উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার করেছে। এ ছাড়াও বৈশ্বিক বাস্তবতার নিরিখে নিজেদের সক্ষমতা ও স্থিতিশীলতা বাড়াতে বিশেষ অংশীদারিত্বমূলক উদ্যোগ ‘বিগ-বি’ এগিয়ে নেয়ার প্রত্যয় জানিয়েছে জাপান ও বাংলাদেশ। এ ছাড়া জাপানের সরকারি নিরাপত্তা সহায়তা কর্মসূচির আওতায় পাঁচটি টহলবোট দেয়ার কথা বলা হয়েছে। ভবিষ্যতে এ কর্মসূচির আওতায় আরও সহযোগিতার সুযোগ খোঁজার অঙ্গীকারও করেছেন তারা। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের বড় অবদানের স্বীকৃতি দিয়ে সমুদ্র পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, উপকূলীয় টহল ও বন্দরের নিরাপত্তায় সহযোগিতা বাড়ানোর কথা জানিয়েছে জাপান। তিনি বলেন, শান্তিপ্রিয় দেশ জাপান ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর প্রথম দিকেই বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদানকারী দেশগুলোর অন্যতম।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নের লক্ষ্যে জাপানের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। একইসঙ্গে খাদ্য, কৃষি, মৎস্য ও পশুপালন খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে উভয় দেশের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মধ্যে পৃথক দুটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, দীর্ঘদিনের এই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও যৌথ সমৃদ্ধির শক্তিশালী চালিকাশক্তিতে রূপান্তর করাই তাদের প্রধান লক্ষ্য।

সফরের অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চিবা প্রিফ্যাকচারের ইচিকাওয়া শহরে অবস্থিত নিটসু লজিস্টিকস হাব পরিদর্শন করেন। এছাড়া স্থানীয় সময় দুপুরে তিনি ফুতসু শহরে জাপানের জেরা (JERA)-র এলএনজি টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র ঘুরে দেখেন। এসব পরিদর্শনে তার সঙ্গে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-১ হুমায়ুন কবির এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতসহ উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব শাহাদাৎ স্বাধীন এ কথা জানান। মঙ্গলবার জাপানের স্থানীয় সময় বিকাল পৌনে ৫ টায় চিবা প্রিফ্যাকচারের ইচিকাওয়া শহরে অবস্থিত নিটসু লজিস্টিকস হাব তিনি পরিদর্শন করেন। জাপানের চিবায় অবস্থিত নিটসু লজিস্টিক হাব মূলত নিপ্পন এক্সপ্রেস কোম্পানির অধীনে পরিচালিত একটি অত্যন্ত আধুনিক ও কৌশলগত মাল্টি-মডেল লজিস্টিক কেন্দ্র। আসিফ আসাদ, ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের বৈদেশিক কর্মসংস্থানবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. মো. শাকিরুল ইসলাম খান, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান এবং প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান।

দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির দেওয়া মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেন তারেক রহমান। এর আগে সংবাদ সম্মেলনে দুই নেতা দ্বিপক্ষীয় ও আঞ্চলিক সহযোগিতার ওপর জোর দেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পারস্পরিক সুবিধাজনক সময়ে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচিকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই সফর দুই দেশের মানুষের মধ্যকার আস্থাকে আরও সুদৃঢ় করবে।

সফরের তৃতীয় দিন বুধবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মিৎসুইসহ জাপানের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সাথে বৈঠক এবং বাংলাদেশ-জাপান ইকোনমিক ফোরামের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। তার এই ব্যস্ত সফরসূচি উভয় দেশের মধ্যকার অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি দ্রুত কার্যকর করা এবং দুই দেশের ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ও জাপানের অংশীদারিত্ব কয়েক দশকের বন্ধুত্ব, আস্থা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। আমরা একসঙ্গে কাজ করলে আমাদের দুই মহান দেশের জন্য আরও সহনশীল ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারবো। আমরা এই দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্বের জন্য গভীরভাবে কৃতজ্ঞ।

শেয়ার করুন