১৩ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চার রাজ্যের বিধান পরিষদ নির্বাচন: চিন্তায় বিজেপি ও কংগ্রেস

প্রকাশ:

ভারতের উত্তর প্রদেশ, মহারাষ্ট্র, বিহার ও কর্ণাটক—এই চার রাজ্যের বিধান পরিষদ নির্বাচনের ফলাফল বড় দুই রাজনৈতিক দল বিজেপি ও কংগ্রেসের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির লোকসভা কেন্দ্র বারানসি এবং রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের (আরএসএস) সদর দপ্তর নাগপুরে বিজেপির হার দলটির জন্য বড় ধাক্কা। অন্যদিকে, মোট ২৮টি আসনের নির্বাচনে নাগপুর ছাড়া অন্য কোথাও কংগ্রেস জয়ী হতে না পারায় দলটি নতুন করে বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে কর্ণাটকে যেখানে তারা ক্ষমতায় রয়েছে, সেখানে ৪টি আসনের সবকটিতেই হার দলের জন্য হতাশাজনক। গতকাল বুধবার এই ফল প্রকাশের পরেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কংগ্রেসকে তীব্র কটাক্ষ করে সমাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘চার বড় রাজ্য উত্তর প্রদেশ, মহারাষ্ট্র, বিহার ও কর্ণাটকে বিধান পরিষদের ২৮ আসনে ভোট হলো। তিন মাসের মধ্যে যে রাজ্যে বিধানসভার ভোট, সেখানে বারানসির মতো আসনে ২ বিধান পরিষদে এসপির কাছে হার এবং এসপির আসন বৃদ্ধি রাজনৈতিক দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ। উত্তর প্রদেশে ভোট হয় ১১ আসনে। বিধান পরিষদের মোট আসনের এক–তৃতীয়াংশ নির্বাচন করেন বিধায়ক ও পৌরসভা-পঞ্চায়েতের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা। ভারতীয় সংসদে যেমন দুটি কক্ষ, লোকসভা ও রাজ্যসভা; তেমনই ভারতের রাজ্যগুলোর নিম্নকক্ষ হলো বিধানসভা, উচ্চকক্ষ বিধান পরিষদ। তবে পশ্চিমবঙ্গ, কেরলমসহ অধিকাংশ রাজ্যেই বিধান পরিষদ তুলে দেওয়া হয়েছে। বিহারে ভোট হয় ৮ আসনে। এই ভোটে বোঝা গেল, বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী সিদ্দারামাইয়ার সঙ্গে রাজনৈতিক সংঘাত না মিটলে কংগ্রেসকে এই রাজ্য হতাশ করতে পারে।

নির্বাচনী ফলাফল ঘোষণার পরপরই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কংগ্রেসকে ব্যঙ্গ করে মন্তব্য করেন।

তিনি বলেন, চার বড় রাজ্যে ব্যালট পেপারে ভোট গ্রহণের পরও কংগ্রেসের জয় নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ইভিএম কারচুপি নিয়ে কংগ্রেসের নিয়মিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে মোদি তাদের মনে করিয়ে দেন যে, এবার নির্বাচন হয়েছে ব্যালট পেপারেই। তবে মোদির এই মন্তব্যের সময় নাগপুরের ফলাফল তখনও চূড়ান্ত হয়নি। পরে দেখা যায়, মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফাডনবিশের নির্বাচনী আসন এবং সংঘের ঘাঁটি নাগপুরে কংগ্রেস প্রার্থী অভিজিৎ ওয়াংজারি ৩ হাজার ২৭১ ভোটে জয়ী হয়েছেন। ওই মন্তব্যের শেষে মোদি চোখে আতশি কাচ ধরা একটা ইমোজি জুড়ে দেন। কংগ্রেস ‘ভোট চুরি’র জন্য নির্বাচন কমিশনের পাশাপাশি দায়ী করে আসছে ইভিএমকেও।

নাগপুরের এই পরাজয়ের পর কংগ্রেস মুখপাত্র পবন খেরা মোদির মন্তব্যের কড়া জবাব দেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, প্রধানমন্ত্রী নিজের লোকসভা এলাকার আসন এবং আরএসএস-এর সদর দপ্তরে পরাজয়ের দায়ভার নেবেন কি না। মূলত উত্তর প্রদেশ ও মহারাষ্ট্রের ফল বিজেপির জন্য অস্বস্তির কারণ হয়েছে। উত্তর প্রদেশের ১১টি আসনের মধ্যে বিজেপি ৬টি জিতলেও সমাজবাদী পার্টি (এসপি) ৫টি আসন জিতে আগের চেয়ে ভালো করেছে। শিক্ষিত ভোটার ও শিক্ষকদের ভোটে এই ফলাফল তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। শিক্ষিত ভোটারদের বিজেপি থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখা ইঙ্গিতবাহী।

ভারতের ৬টি রাজ্যে বিধান পরিষদ টিকে আছে। এবার যে চার রাজ্যে ভোট হয়েছে, সেখানে শিক্ষক ও স্নাতক ভোটাররাই ছিলেন মূল নির্বাচক। মহারাষ্ট্রের ৫টি আসনের মধ্যে বিজেপির নেতৃত্বাধীন মহাজুটি জিতেছে মাত্র ২টি, আর বিরোধী জোট এমভিএ পেয়েছে ৩টি। উল্লেখ্য যে, এই নাগপুর আসনটি টানা ২৪ বছর নিতিন গড়করির নিয়ন্ত্রণে ছিল। এর আগেও ২০২০ সালে এখানে কংগ্রেস জয়লাভ করেছিল। এবার মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফাডনবিশ ও নিতিন গড়করি আসনটি পুনরুদ্ধারে ব্যাপক চেষ্টা চালালেও তা সফল হয়নি। ওই রাজ্যে ৪ আসনের প্রতিটিতেই তারা হেরেছে। মোট আসনের ১২ ভাগের এক ভাগের নির্বাচকমণ্ডলী হলেন শিক্ষক সমাজ ও স্নাতকেরা। মোট আসনের ৬ ভাগের এক ভাগকে মনোনীত করেন রাজ্যপাল। এই আসনটি ২০২০ সালেও কংগ্রেস জিতেছিল। কিন্তু এবার তা ছিনিয়ে নিতে সেখানকার বাসিন্দা ও সেখান থেকে বিধানসভায় নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী ফাডনবিশ এবং সেখানকার সংসদ সদস্য নিতিন গড়করি চেষ্টার ত্রুটি রাখেননি। কিন্তু দেখা গেল, জেতা আসনটিও হাতছাড়া হলো। বিজেপিও তাদের জেতা তিনটি আসনই ধরে রেখেছে।

কর্ণাটকের ফলাফল কংগ্রেসের জন্য চরম উদ্বেগের। মুখ্যমন্ত্রিত্ব পাওয়ার পর ডি কে শিবকুমারের নেতৃত্বাধীন এই ভোটে কংগ্রেসের প্রত্যাশা ছিল অনেক। কিন্তু ৩টি আসন বিজেপির দখলে থাকা অবস্থায় কংগ্রেস তাদের একটি আসনও ধরে রাখতে পারেনি। কর্ণাটকে বিজেপির শরিক দল জেডি(এস) কংগ্রেসকে হারিয়ে আসনটি দখল করে নেয়। ২০২৮ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে দল গোছানোর প্রক্রিয়া নিয়ে সিদ্দারামাইয়া ও শিবকুমারের মধ্যকার দ্বন্দ্ব নিরসন এখন কংগ্রেসের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিহারের নির্বাচনী চিত্র ছিল ভিন্ন। সেখানে ৮টি আসনের মধ্যে বিজেপি ৩টি, জেডি(ইউ) ১টি, আরজেডি ১টি এবং জনসুরাজ পার্টি ১টি আসনে জিতেছে। অবশিষ্ট দুটি আসনে জয় পেয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। প্রশান্ত কিশোরের জনসুরাজ পার্টি দ্বারভাঙা শিক্ষক আসনে জয়লাভ করে কংগ্রেস প্রার্থীকে ৩২৪ ভোটে হারিয়েছে। বাঁকিপুরের উপনির্বাচনের পর বিধান পরিষদ নির্বাচনেও জনসুরাজ পার্টির এই সাফল্য বিহারের রাজনীতিতে তাদের শক্ত অবস্থান জানান দিচ্ছে।

শেয়ার করুন