১৬ আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

৫ আগস্ট: এটি কি গণঅভ্যুত্থান, নাকি বিপ্লব?

প্রকাশ:

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া রাজনৈতিক পরিবর্তন নিয়ে জনসাধারণের মধ্যে নানা বিভ্রান্তি ও সংশয় দেখা দিয়েছে। অনেকেই এই দিনটিকে গণঅভ্যুত্থান হিসেবে অভিহিত করেন, আবার কেউ কেউ একে বিপ্লব বলে দাবি করেন। বিশিষ্ট আইনজীবী, সংবিধান বিশেষজ্ঞ এবং রাষ্ট্রচিন্তক নাজির আহমদের মতে, বক্তৃতা বা লেখায় বিভ্রান্তি এড়াতে ইতিহাস ও যুক্তির নিরিখে এই দুটির পার্থক্য বোঝা জরুরি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টে কী ঘটেছিল তা নিয়ে অনেকের মধ্যে বিভ্রান্তি আছে। বক্তৃতা, বিবৃতি ও লেখায় অনেক বিদগ্ধ ব্যক্তিরা পর্যন্ত তালগোল পাকিয়ে ফেলেন। আমরা এ কলামে ইতিহাস, তথ্য ও যুক্তির নিরিখে পর্যালোচনা করবো ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আসলে কী সংগঠিত হয়েছিল-গণঅভ্যুত্থান না বিপ্লব। গণঅভ্যুত্থানে রাজপথে জনতার ঢল ও ক্ষোভের অভাবনীয় বিস্ফোরণ ঘটে।

গণঅভ্যুত্থান হলো সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত গণজোয়ার, যা সাধারণত কোনো শাসক বা সরকারের পতন ঘটায়। এতে ব্যাপক জনসম্পৃক্ততা, তাৎক্ষণিক অসন্তোষ ও তার দ্রুত বিস্তার, বিদ্যমান ব্যবস্থার প্রতিরোধ এবং যৌথ নেতৃত্বের প্রতিফলন ঘটে। এর মূল উপাদানের মধ্যে রয়েছে যৌথ সামাজিক পরিচয়, নির্দিষ্ট দাবি বা ইশতেহার—যেমন ১৯৬৯ সালের ছাত্র আন্দোলনের ১১ দফা—এবং কোনো ঘটনার ট্রিগার পয়েন্ট। মিশরের ডেমোক্রেসি মুভমেন্টের নেতা ওয়েল ঘনিম বলেছেন, “ক্ষমতাসীনদের চেয়ে জনগণের শক্তি অনেক বেশি শক্তিশালী।” আবার অ্যাবি হফম্যানের মতে, “জনগণ যখন রুখে দাঁড়ায়, তখন সরকারকে পিছু হটতে হয়।” সাধারণত দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক নিপীড়ন, অর্থনৈতিক বৈষম্য, ব্যাপক দুর্নীতি ও অবৈধভাবে ক্ষমতা আঁকড়ে রাখার প্রতিক্রিয়ায় সাধারণ নাগরিকরা যখন রাজপথে নেমে আসে, তখন তা গণঅভ্যুত্থানের রূপ নেয়। গণঅভ‍্যূত্থান সম্পর্কে মিশরীয় প্রো-ডেমোক্রেসি মুভমেন্টের নেতা Wael Ghonim বলেন “The power of the people is much stronger than the people in power” (অর্থাৎ “ক্ষমতাসীনদের চেয়ে জনগণের শক্তি অনেক বেশি শক্তিশালী”)।

ইতিহাসে বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য গণঅভ্যুত্থানের উদাহরণ রয়েছে

  1. ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, যার ফলে আইয়ুব খানের পতন ঘটে এবং পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।
  2. ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান, যা প্রেসিডেন্ট এরশাদের প্রায় এক দশকের স্বৈরশাসনের অবসান ঘটায়।
  3. আরব বসন্ত (২০১০-২০১১), যার ফলে তিউনিসিয়া, মিশর ও লিবিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশে একনায়কতন্ত্রের পতন ঘটে।

অন্যদিকে, বিপ্লব হলো সমাজ ব্যবস্থার কাঠামোগত ও মৌলিক রূপান্তর। এটি কেবল সরকার বদল নয়, বরং পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থাকে বদলে দিয়ে নতুন কোনো ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়। এর প্রধান উপাদান হলো বিকল্প বৈপ্লবিক আদর্শ, সুসংগঠিত নেতৃত্ব, বিপ্লবী সংগঠন এবং শাসকগোষ্ঠীর সংকট। বিপ্লবের লক্ষ্য কেবল প্রতিবাদ নয়, বরং বিবর্তন। চে গুয়েভারার ভাষায়, “বিপ্লব এমন কোনো আপেল নয়, যা পেকে গেলেই নিজে থেকে নিচে পড়ে যায়; একে নিচে নামিয়ে আনতে হয়।” ইতিহাসে বিপ্লবের কিছু উদাহরণ হলো

  1. ফরাসি বিপ্লব (১৭৮৯): রাজতন্ত্র ও সামন্তবাদের অবসান ঘটিয়ে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা।
  2. রুশ বিপ্লব (১৯১৭): বলশেভিকদের নেতৃত্বে জার শাসনের অবসান ও সমাজতান্ত্রিক সরকার গঠন।
  3. ইরানি বিপ্লব (১৯৭৯): ইরানকে ইসলামি প্রজাতন্ত্রে পরিণত করা।
  4. চীন বিপ্লব (১৯১১): সিনহাই বিপ্লবের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের রাজবংশের অবসান।

পর্যালোচনায় দেখা যায়, ৫ আগস্টের ঘটনাটি একটি স্বতঃস্ফূর্ত গণঅভ্যুত্থান ছিল, বিপ্লব নয়। এর কারণ হিসেবে বলা যায়, গণঅভ্যুত্থানের সব বৈশিষ্ট্য এতে উপস্থিত থাকলেও বিপ্লবের প্রধান শর্তগুলো—যেমন সুনির্দিষ্ট বৈপ্লবিক সংগঠন, আদর্শিক নেতৃত্ব এবং আমূল কাঠামোগত পরিবর্তন—সেখানে অনুপস্থিত ছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার ১৫ বছরের স্বৈরশাসনের অবসান হলেও সমাজ ও রাষ্ট্রের কাঠামোগত কোনো আমূল পরিবর্তন ঘটেনি। কোটা পদ্ধতি সংস্কারের দাবি থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলনটি শেষ পর্যন্ত দলমত নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের এক দফায় রূপ নিয়েছিল, যা স্বতঃস্ফূর্ত গণঅভ্যুত্থানেরই প্রমাণ। তাই এই পরিবর্তনকে বিপ্লব হিসেবে আখ্যা দেওয়া ঐতিহাসিক ও যৌক্তিকভাবে কঠিন।

শেয়ার করুন