১৯ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে প্রথম মুসলিম ইতিহাস গড়লেন আবদুল আল-সাইয়েদ

প্রকাশ:

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে মিশিগান অঙ্গরাজ্য থেকে জয়ী হয়ে ইতিহাস গড়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল আল-সাইয়েদ। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে মুসলিমদের প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে হারিয়ে তিনি মার্কিন সিনেটের ২৩৭ বছরের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন।

৪২ বছর বয়সী এই মিসরীয় বংশোদ্ভূত রাজনীতিক অবসরে যাওয়া ডেমোক্র্যাট সিনেটর গ্যারি পিটার্সের আসনে জয়লাভ করেন। ১৭৮৯ সালে সিনেটের কার্যক্রম শুরুর পর থেকে এতদিন কোনো মুসলিমের এই উচ্চকক্ষে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি, যা এবার আল-সাইয়েদ ভেঙে দিলেন।

মিশিগানের রচেস্টার হিলসে জন্মগ্রহণকারী আল-সাইয়েদ রাজনীতিতে আসার আগে চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচিতি পান। ২০০৭ সালে ইউনিভার্সিটি অব মিশিগান থেকে স্নাতক ডিগ্রিধারী এই রাজনীতিক ২০১১ সালে রোডস স্কলার হিসেবে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে জনস্বাস্থ্য বিষয়ে ডক্টরেট অর্জন করেন। এছাড়া ২০১৪ সালে তিনি কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। দীর্ঘ সময় তিনি জনস্বাস্থ্য ও মানবিক সেবায় যুক্ত ছিলেন।

২০১৫ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ডেট্রয়েট শহরের স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। পরে ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ওয়েইন কাউন্টির স্বাস্থ্য, মানবিক ও প্রবীণ সেবাবিষয়ক বিভাগের প্রধান হিসেবে কাজ করেন। এরপর ২০২৬ সালের নির্বাচনী রাজনীতিতে ফিরে গত আগস্টে প্রাথমিক বাছাই পর্বে তিনি প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য হেইলি স্টিভেন্সকে পরাজিত করেন। ২০২৬ সালের নভেম্বরের এ নির্বাচনে জয়ের মাধ্যমে আল-সাইয়েদ সেই ধারা ভাঙলেন। শহরটির আর্থিক সংকটের পর জনস্বাস্থ্যসেবা পুনর্গঠনের উদ্যোগ তদারকির দায়িত্ব ছিল তাঁর। এই কাউন্টির মধ্যেই ডেট্রয়েট শহর অবস্থিত।

তাঁর নির্বাচনী প্রচারে স্বাস্থ্যসেবা খাত শক্তিশালী করা, সবার জন্য মেডিকেয়ার কর্মসূচি, আবাসন সংকট মোকাবিলা ও শ্রমজীবী মানুষের অর্থনৈতিক সুযোগ বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি গুরুত্ব পেয়েছে। এছাড়া গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের কড়া সমালোচক ছিলেন তিনি। তিনি ইসরায়েলকে নিঃশর্ত সামরিক সহায়তা বন্ধের আহ্বান জানানোর পাশাপাশি ইসরায়েলি কার্যক্রমকে গণহত্যা হিসেবে আখ্যায়িত করেন, যা নির্বাচনের অন্যতম আলোচিত বিষয় ছিল। উল্লেখ্য, রোডস স্কলারশিপ হলো বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন, অভিজাত ও মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক পোস্টগ্র্যাজুয়েট স্কলারশিপ প্রোগ্রাম।

নির্বাচনী প্রচারে প্রভাবশালী প্রগতিশীল নেতা বার্নি স্যান্ডার্স, আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজ এবং রাশিদা তালিবের সমর্থন পেয়েছেন তিনি। তবে দলের ভেতরে ইসরায়েল ইস্যুসহ বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর অবস্থান নিয়ে বিতর্কও ছিল। এমনকি নির্বাচনের মাত্র দুদিন আগে ডেমোক্র্যাট নেতা হেইলি স্টিভেন্স দলের প্রার্থী আল-সাইয়েদের বিরোধিতা করে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে সমর্থন জানান, যা নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। আবদুল আল–সাইয়েদের নির্বাচনী প্রচারে ডেমোক্রেটিক পার্টির ভেতরের বিভক্তি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দলীয় নেতার সমর্থন হারানোর দিনই আল–সাইয়েদের তহবিলে রেকর্ড অর্থ।

আল-সাইয়েদের মুসলিম পরিচিতি নিয়েও প্রচারে নানা প্রশ্ন তোলা হয়েছিল। খোদ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ রিপাবলিকান নেতারা তাঁর ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে সমালোচনা করেন। এসবের জবাবে আল-সাইয়েদ দাবি করেন, জনগণের জীবনযাত্রার ব্যয় ও দেশের আসল অর্থনৈতিক সংকট থেকে মানুষের দৃষ্টি সরাতেই প্রেসিডেন্ট তাঁর নাম ও ধর্মীয় পরিচয় ব্যবহার করছেন। সকল বাধা ও বিতর্ক ছাপিয়ে শেষ পর্যন্ত তিনি জয় ছিনিয়ে নেন।

উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের নিম্নকক্ষে এর আগেও মুসলিম প্রতিনিধিরা দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০০৬ সালে কিথ এলিসন প্রথম মুসলিম হিসেবে মার্কিন কংগ্রেসে নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে ২০১৮ সালে রাশিদা তালিব ও ইলহান ওমর প্রথম মুসলিম নারী হিসেবে কংগ্রেসের সদস্য নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন। তবে সিনেটের উচ্চকক্ষে এটিই প্রথম কোনো মুসলিমের প্রতিনিধিত্ব।

শেয়ার করুন