৯ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ফ্রান্সজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ ও সংঘর্ষ, গ্রেপ্তার ১০০০

প্রকাশ:

জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় ও স্কুল ব্যবস্থার বেহাল দশার প্রতিবাদে ফ্রান্সজুড়ে আবারো ফুঁসে উঠেছে সাধারণ মানুষ। শনিবার দেশজুড়ে লাখ লাখ বিক্ষোভকারী রাজপথে নেমে আসেন। উত্তাল এই আন্দোলনে বিভিন্ন শহরে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়লে পুলিশ প্রায় এক হাজার ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্যারিসসহ দেশের বিভিন্ন শহরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করতে বাধ্য হয়েছে। ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার দেশটিতে প্রায় ৪ লাখ ১০ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন, যদিও শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর দাবি এই সংখ্যা প্রায় ৮ লাখ। বিশৃঙ্খলা রোধে এদিন প্রায় ৭০ হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছিল। বিবিসি বলছে, অভিযানে সংগঠিত অপরাধ ও সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় সাধারণত ব্যবহৃত একটি বিশেষায়িত পুলিশ ইউনিটও অংশ নিয়েছে। এদিকে ফ্রান্সের তৃতীয় বৃহত্তম শহরের এক বিক্ষোভকারী বলেন, ‘আমরা প্রায় ১৫০ জন ছিলাম। গত সপ্তাহের বিক্ষোভ-সহিংসতায় ফ্রান্সের আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। একটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গাড়িকে জ্বলন্ত ব্যারিকেডের মধ্য দিয়ে চলতে দেখা গেছে। তাদের একজন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় তুলুজ শহরের, অন্যজন মধ্য ফ্রান্সের ক্লেরমঁ-ফেরাঁর বাসিন্দা।

বিক্ষোভের শুরুর দিকে প্যারিসের পোর্ট দ্য ইতালি থেকে পোর্ট দ্য ভিনসেন পর্যন্ত মিছিলটি শান্তিপূর্ণ থাকলেও সন্ধ্যার দিকে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। বিক্ষোভকারীদের একাংশের সঙ্গে দাঙ্গা পুলিশের সংঘর্ষ বাধে। এ সময় আন্দোলনকারীরা অস্থায়ী ব্যারিকেড তৈরি করে পুলিশকে লক্ষ্য করে বিভিন্ন বস্তু ছুড়ে মারেন। মুখোশধারী একদল তরুণ একটি গাড়ির শোরুম ভাঙচুরের চেষ্টা করলে পুলিশ লাঠিচার্জ করে তাদের সরিয়ে দেয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ জানান, মিছিলের পেছনের সারিতে থাকা কয়েক হাজার উগ্রপন্থী কর্মীর মধ্যে অন্তত ৫০০ জনকে দাঙ্গায় সরাসরি জড়িত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গত সপ্তাহের তুলনায় এবার দাঙ্গা ও লুটপাটের ঘটনা কিছুটা কম হলেও প্যারিসে ১৪২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গত সপ্তাহের একই দিনে গ্রেপ্তারের সংখ্যার তুলনায় এটি অর্ধেকেরও কম।

দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মার্সেইয়ে বিক্ষোভকারীরা রাস্তায় ময়লার পাত্রে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং ধাতব পাত ব্যবহার করে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর বোর্দোতে কালো পোশাক ও মুখোশ পরিহিতরা একটি ভবনের কাঠের পাটাতন খুলে সড়কে ব্যারিকেড তৈরির চেষ্টা চালায়। লিয়ঁ শহরেও নিষিদ্ধ ঘোষিত এলাকায় জড়ো হওয়া জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশকে কাঁদানে গ্যাস ছুড়তে হয়। বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষের ঘটনায় অন্তত দুজন গুরুতর আহত হয়েছেন। তুলুজে ২০ বছর বয়সী এক বিক্ষোভকারীর হাতের কয়েকটি আঙুল বিস্ফোরকজাতীয় বস্তু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে বলে স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মী জানিয়েছেন। এছাড়া মার্সেইয়ের বুশ-দ্যু-রোন অঞ্চলে সাতটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান লুটপাট বা ভাঙচুরের শিকার হয়েছে। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্সেইয়ে জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে রাস্তায় তৈরি ব্যারিকেড। বেশির ভাগই মাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। এ ছাড়া রোববার ভোরেও বিভিন্ন এলাকায় উত্তেজনা অব্যাহত ছিল।

বিক্ষোভকারীদের প্রধান ক্ষোভের কারণ হলো জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয় এবং সরকারের কর নীতি। প্যারিসে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ২৬ বছর বয়সী জেলি নামক এক নারী জানান, প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ক্ষমতায় আসার পর থেকে জনগণ হতাশায় ভুগছে। তিনি বলেন, তারা আমাদের কথা শোনে না, বরং অতিরিক্ত করের বোঝা চাপিয়ে চুপ করিয়ে রাখে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কিশোর বিক্ষোভকারীও জানান, তাদের প্রজন্ম নিজেদের বর্তমান ব্যবস্থায় পরিত্যক্ত মনে করছে। অন্যদিকে, ওর্লেয়াঁ শহরে কট্টর ডানপন্থি ন্যাশনাল র‌্যালি দলের বিরুদ্ধে আয়োজিত সমাবেশে প্রায় ১৩ হাজার মানুষ অংশ নিয়ে ভিন্নমতের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন। আমাদের টাকা নেয়, অনেক কর আরোপ করে, অথচ আমরা কিছু বলতে পারি না।

আগামী ছয় মাসের মধ্যে অনুষ্ঠিতব্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে ফ্রান্সের রাজনৈতিক অঙ্গনে চরম মেরুকরণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আগামী বসন্তে ম্যাক্রোঁর মেয়াদ শেষ হতে চলেছে। বর্তমান জনমত জরিপগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, পরবর্তী নির্বাচনে মারিন লে পেনের নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল র‌্যালি এবং কট্টর বামপন্থি দল লা ফ্রঁস ইনসুমিজের প্রার্থীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হতে পারে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পাল্টাপাল্টি দোষারোপের কারণে এই অস্থিরতা আগামী দিনে আরও ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

শেয়ার করুন