জাপানের জনসংখ্যা হ্রাস ও বার্ধক্যজনিত শ্রমিক সংকট বাংলাদেশের জন্য এক বিশাল অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করেছিল। অথচ যথাযথ দক্ষতা, জাপানি ভাষার অভাব এবং চাহিদা অনুযায়ী প্রশিক্ষণের অভাবে এই সম্ভাবনা কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। জনশক্তি রপ্তানিকে দক্ষ জনবল হিসেবে না দেখে কেবল সংখ্যাগত সাফল্য হিসেবে পরিমাপ করা, নীতিনির্ধারণী ব্যর্থতা এবং নিয়োগকর্তাদের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক গড়ে তুলতে না পারার ফলে এই জনসংখ্যাগত সুবিধা টেকসই কর্মসংস্থানে রূপান্তর করা যায়নি। বিদেশি শ্রমবাজারের চাহিদা অনুমাননির্ভরভাবে নয়, তথ্যভিত্তিকভাবে নির্ধারণের সক্ষমতা কেন তৈরি হয়নি। এই ব্যর্থতা কোনো ব্যক্তির নয়; এটি নীতিনির্ধারণ ও প্রতিষ্ঠান পরিচালনার দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা।
জাপানের বাজারে প্রবেশের ব্যর্থতার ইতিহাস বেশ পুরনো। জাপানের শ্রমবাজারে অতীতে ব্যর্থতার নির্দিষ্ট নজিরও কম নেই। অর্থাৎ যে শ্রমবাজারে প্রবেশের জন্য প্রস্তুতি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে প্রস্তুতির সুযোগই সবার জন্য সমান নয়।
২০০৫ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশ-জাপান দ্বিপক্ষীয় চুক্তির আওতায় জাপানে বাংলাদেশি কর্মীদের কারিগরি প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু পরবর্তী আট বছরে সরকারি সংস্থা বিএমইটি ১২ জন এবং বেসরকারি রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো মাত্র ২৯ জন কর্মী পাঠাতে সক্ষম হয়েছিল।
মোট ৪১ জনের এই নগণ্য সংখ্যা বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণী ও প্রশাসনিক অদক্ষতার একটি বিব্রতকর উদাহরণ হয়ে আছে। যদিও জাপানের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বাংলাদেশি কর্মীদের চাহিদা ছিল, তবুও ভাষাগত দক্ষতা, উপযুক্ত কর্মী বাছাইয়ে ত্রুটি এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়হীনতা এই বড় সুযোগকে ব্যাহত করেছে। ভাষাগত অদক্ষতা, অনুপযুক্ত কর্মী নির্বাচন, দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়হীনতা সেই সুযোগ কাজে লাগানোর পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
পরবর্তী সময়ে ২০১৫ সালে জাপানের আইএম জাপানের সঙ্গে ৫০০ কর্মীর প্রশিক্ষণের সমঝোতা এবং ২০১৭ সালে উৎপাদন ও নির্মাণ খাতে এক বছর মেয়াদি প্রশিক্ষণের নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে এসব বিচ্ছিন্ন উদ্যোগকে বৃহৎ পরিসরে নিয়মিত কর্মসংস্থান কর্মসূচিতে রূপ দেওয়ার সক্ষমতা আমাদের ছিল না। ২০১৯ সালের ২৭ আগস্ট জাপানের সঙ্গে নির্দিষ্ট দক্ষতাভিত্তিক কর্মী বা এসএসডব্লিউ পাঠানোর বিষয়ে কাঠামোগত সহযোগিতা স্মারক স্বাক্ষরিত হওয়ার পরও ভাষা শিক্ষা, দক্ষতা যাচাই ও স্বচ্ছ নিয়োগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা রয়েই গেছে। আমাদের ভুল ছিল, অভিবাসনকে অনেকাংশে ব্যক্তির নিজস্ব উদ্যোগ ও আর্থিক সামর্থ্যের ওপর ছেড়ে দেওয়া।
জাপানের অভিবাসন কর্তৃপক্ষের জরিপে বিভিন্ন দেশের প্রশিক্ষণার্থীরা জানিয়েছেন, তারা নিজ দেশের মধ্যস্থতাকারীদের উচ্চ ফি দেওয়ার কারণে ঋণের বোঝা বহন করছেন। বাংলাদেশ যে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক নিয়োগব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেনি, তা এই জরিপ থেকেই স্পষ্ট। কেবল সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করাই সাফল্য নয়, বরং একে কম অভিবাসন ব্যয় ও টেকসই কর্মসংস্থানে রূপান্তরিত করাই মূল চ্যালেঞ্জ। তৃতীয় ভুল: কম খরচে নির্ভরযোগ্য নিয়োগব্যবস্থা গড়তে না পারা। চতুর্থ ভুল: প্রতিযোগীদের গুরুত্ব বুঝতে না পারা।
আমাদের অভিবাসন প্রক্রিয়ার বড় দুর্বলতা হলো প্রশিক্ষণ ও বাস্তব নিয়োগের মধ্যকার বিচ্ছিন্নতা। কোন খাতে কত কর্মী প্রয়োজন, জাপানি নিয়োগকর্তারা কী যোগ্যতা খুঁজছেন—এই তথ্যগুলো আগে বিশ্লেষণ করার কথা থাকলেও প্রশিক্ষণকেন্দ্রের সংখ্যা বা সনদ বিতরণকেই সাফল্য হিসেবে দেখা হয়েছে। জাপানি ভাষা শিক্ষা, পেশাগত দক্ষতা অর্জন এবং যোগ্যতা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ। প্রশিক্ষণ শেষে নিশ্চিত কর্মসংস্থান না থাকায় অনেক তরুণের সময় ও অর্থ উভয়ই নষ্ট হচ্ছে। কিন্তু প্রশিক্ষণকেন্দ্রের সংখ্যা, প্রশিক্ষণার্থীর সংখ্যা কিংবা সনদ বিতরণকে সাফল্য হিসেবে দেখার প্রবণতা প্রকৃত ফলাফলকে আড়াল করেছে। দ্বিতীয় ভুল: ভাষাকে দক্ষতার কেন্দ্রীয় শর্ত হিসেবে না দেখা। এখানে রাষ্ট্রের দায়িত্ব ছিল শুধু প্রশিক্ষণকেন্দ্র স্থাপন নয়; বরং ভাষা শিক্ষা, পেশাগত প্রশিক্ষণ ও নিয়োগকে একই ব্যবস্থার মধ্যে আনা। এর সঙ্গে নিয়োগের অনিশ্চয়তা যুক্ত হলে একজন তরুণ ও তাঁর পরিবারের জন্য ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
জাপানে কাজের জন্য ভাষাজ্ঞান নিছক অতিরিক্ত যোগ্যতা নয়; কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও দৈনন্দিন জীবনের জন্য এটি অপরিহার্য। দুর্ভাগ্যবশত, এই শিক্ষাকে সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী করার বদলে ঢাকাকেন্দ্রিক সুযোগ এবং উচ্চ ব্যয়ের কারণে সাধারণ তরুণরা পিছিয়ে পড়ছেন। এছাড়া, অভিবাসন খাতে মধ্যস্বত্বভোগীদের দাপট, অস্বচ্ছ ফি এবং অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে অনেক কর্মী বিদেশ যাওয়ার আগেই ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন। জাপানি নিয়োগকর্তারা এমন অংশীদার খুঁজছেন যারা নির্ভরযোগ্য, কিন্তু বাংলাদেশ এখনো স্বচ্ছ ও নিয়মিত নিয়োগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারছে না। ফলে জাপানে যেতে আগ্রহী অনেকেই প্রস্তুতির পর্যায়েই পিছিয়ে পড়েন। বাংলাদেশের অভিবাসনব্যবস্থায় মধ্যস্বত্বভোগী, অস্বচ্ছ ফি, প্রতারণা ও অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অন্যদিকে, জাপানি নিয়োগকর্তারাও এমন অংশীদার চান, যাদের মাধ্যমে নির্ভরযোগ্যভাবে উপযুক্ত কর্মী পাওয়া যাবে।
প্রতিযোগী দেশগুলো তাদের অভিজ্ঞতার আলোকে জাপানি ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিতি বাড়িয়ে কর্মক্ষেত্রে আধিপত্য বিস্তার করছে। বাংলাদেশ বড় জনসংখ্যার দেশ হিসেবে আত্মতুষ্টিতে থাকলেও, নীতিনির্ধারকরা প্রতিযোগী দেশগুলোর কৌশল বিশ্লেষণের প্রয়োজনীয়তা উপেক্ষা করেছেন।
বর্তমান এই সংকট কাটাতে পাঁচ বছর মেয়াদি পরিমাপযোগ্য কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের সাফল্য সনদ বিতরণে নয়, বরং কতজন কর্মী বাস্তব কর্মসংস্থান পেলেন এবং কতজন টিকে রইলেন—তার ওপর নির্ভর করতে হবে। এছাড়া, জাপানি শিল্প সংগঠনের সঙ্গে সরাসরি অংশীদারত্ব বাড়ানো, ভাষা শিক্ষার সুযোগ জেলা পর্যায়ে সম্প্রসারণ, এবং নিয়োগ ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক।
কর্মীদের চুক্তিনামায় বেতন, আবাসন ও কর্মঘণ্টার স্বচ্ছতা থাকা এবং যেকোনো সমস্যায় বাংলা ভাষায় আইনি সহায়তা পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর সফরের মতো বড় কূটনৈতিক সুযোগগুলোকে কেবল সমঝোতা স্মারকের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে, তা থেকে ডেঙ্গুর টিকার মতো প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি বা কর্মসংস্থানের সুফল কীভাবে ঘরে তোলা যায়, তা ভাবতে হবে। মনে রাখতে হবে, জাপানের এই সুযোগ চিরকাল থাকবে না; অতীতের ভুল সংশোধন করে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে নতুন প্রজন্মের জন্য এই পথ আরও সংকুচিত হয়ে পড়বে। প্রথম ভুল: চাহিদার আগে প্রশিক্ষণ, চাকরির নিশ্চয়তা ছাড়া বিনিয়োগ।





