তত্ত্বাবধায়ক সরকার: পঞ্চদশ সংশোধনীর আপিলের রায় ৯ জুলাই

প্রকাশ:

সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল সংক্রান্ত হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের শুনানি শেষ হয়েছে। প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ আগামী ৯ জুলাই এই আপিলের রায় ঘোষণার দিন ধার্য করেছেন।

গত বুধবার (৮ জুলাই) রিটকারী এবং রাষ্ট্রপক্ষের অ্যাটর্নি জেনারেলের শুনানি সম্পন্ন হয়। শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক উপস্থিত ছিলেন। অন্যদিকে, আপিলকারীদের পক্ষে আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া (বদিউল আলম মজুমদারের আইনজীবী) এবং মোহাম্মদ শিশির মনির (জামায়াতের আইনজীবী) অংশ নেন।

শুনানিতে অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়েছিল। তিনি আপিলে পঞ্চদশ সংশোধনীর কিছু বিষয় সংসদের ওপর ছেড়ে দিতে বলেছেন এবং বিশ্বাস করেন যে বাকি অংশটুকু আদালত দেখবেন। তিনি আরও জানান, আইন পুরোটা বাতিল না করে কিছু বিধান জাতীয় সংসদ আইন অনুসারে জনগণের মতামত নিয়ে সংশোধন, পরিমার্জন ও পরিবর্তনের বিষয়ে তারা বক্তব্য দিয়েছেন।

রিটকারী বদিউল আলম মজুমদারের আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন, ‘পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে, সংবিধান ধ্বংস করা হয়েছে। এ সংশোধনী পুরোটা বাতিল হওয়া উচিত।’ তিনি আরও বলেন, ‘এর মাধ্যমে সংবিধানের মৌলিক চরিত্র পরিবর্তন করা হয়েছে। এটি বাতিল হওয়া প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের জনবিরোধী সংশোধনী আর না হয় এবং জনগণের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা নস্যাৎ করা না যায়।’

অন্যদিকে, জামায়াতের পক্ষের আইনজীবী শিশির মনির আদালতকে জানান, যদি পঞ্চদশ সংশোধনী পুরোটি বাতিল করা হয়, তবে ‘বাকশাল’ ফিরে আসবে। তিনি আরও বলেন, এই সংশোধনীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাসহ অনেক অন্যান্য বিষয় জড়িত রয়েছে, যার মধ্যে মূল বিষয় হলো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিলুপ্তি। তাই হাইকোর্টের রায়ের যে অংশটুকু সংবিধান ও রাষ্ট্রের মৌলিক অধিকারের সাথে সাংঘর্ষিক তা বাতিল করে হাইকোর্টের রায় বহাল রাখা যেতে পারে। বাকি রাজনৈতিক বিতর্কের অংশটুকু জাতীয় সংসদের ওপর ছেড়ে দেওয়া হোক, কারণ রাজনৈতিক বিষয়ে আদালত সিদ্ধান্ত দিলে তা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।

এর আগে গত বছরের ১৩ নভেম্বর বহুল আলোচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলসহ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে আনা কয়েকটি বিষয় অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের অনুমতি দেন সর্বোচ্চ আদালত। ওই দিনই সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারের পক্ষে আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া পঞ্চদশ সংশোধনীর পুরোটা বাতিলের আবেদন জানিয়ে লিভ টু আপিল দায়ের করেন।

২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর হাইকোর্ট বহুল আলোচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলসহ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে আনা কয়েকটি বিষয় অবৈধ ঘোষণা করেন। একইসঙ্গে উচ্চ আদালত সংবিধানে গণভোটের বিধান ফিরিয়ে আনেন। তবে এই রায়ে পঞ্চদশ সংশোধনী পুরোটা বাতিল করা হয়নি।

আদালত রায়ের পর্যবেক্ষণে বলেছেন, গণতন্ত্র আমাদের সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অংশ। অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং প্রভাবমুক্ত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এই গণতন্ত্র বিকশিত হয়। কিন্তু দলীয় সরকারের অধীনে বিগত তিনটি সংসদ নির্বাচনে জনগণের ইচ্ছার কোনো প্রতিফলন হয়নি। দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচনের আত্মবিশ্বাস জনগণের মধ্যে জন্ম নেয়নি, যার ফলশ্রুতিতে জুলাই গণঅভ্যুত্থান হয়েছিল।

রায়ে হাইকোর্ট বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা জনগণের অভিপ্রায় অনুযায়ী সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল এবং এটি সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অংশে পরিণত হয়েছে। বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর হাইকোর্ট বেঞ্চ এই রায় ঘোষণা করেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্তি–সংক্রান্ত পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের ২০ ও ২১ অনুচ্ছেদ সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও বাতিল ঘোষণা করে এ রায় দেন হাইকোর্ট। রায়ে আদালত বলেন, অনুচ্ছেদ দুটি সংবিধানের মৌলিক কাঠামোকে ধ্বংস করেছে, যেটি হচ্ছে গণতন্ত্র। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে যুক্ত ৭ক, ৭খ, ৪৪ (২) অনুচ্ছেদও সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও বাতিল ঘোষণা করেছেন আদালত। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ৫৪টি ক্ষেত্রে সংযোজন, পরিমার্জন ও প্রতিস্থাপন আনা হয়েছিল।

রায়ে আদালত আরও বলেন, পঞ্চদশ সংশোধনী আইন পুরোটা বাতিল করা হচ্ছে না। বাকি বিধানগুলোর বিষয়ে আগামী জাতীয় সংসদ আইন অনুসারে জনগণের মতামত নিয়ে সংশোধন, পরিমার্জন ও পরিবর্তন করতে পারবে। এর মধ্যে জাতির পিতার স্বীকৃতির বিষয়, ২৬ মার্চের ভাষণের বিষয়গুলো রয়েছে। গণভোটের বিষয়ে রায়ে হাইকোর্ট বলেন, গণভোটের বিধান বিলুপ্ত করা হয়, যেটি সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদের অংশ ছিল। এ বিধান বিলুপ্তি সংক্রান্ত পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের ৪৭ ধারা সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ায় বাতিল ঘোষণা করা হলো। ফলে দ্বাদশ সংশোধনীর ১৪২ অনুচ্ছেদ পুনর্বহাল করা হলো।

হাইকোর্টের রায়ে ৭ ক অনুচ্ছেদে সংবিধান বাতিল, স্থগিতকরণ ইত্যাদি অপরাধ এবং ৭ খ অনুচ্ছেদে সংবিধানের মৌলিক বিধানাবলি সংশোধন অযোগ্য করার কথা বলা ছিল। এদিকে ৪৪ অনুচ্ছেদের ২ ধারা বলছে, এই সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীন হাইকোর্ট বিভাগের ক্ষমতার হানি না ঘটিয়ে সংসদ আইনের দ্বারা অন্য কোনো আদালতকে তার এখতিয়ারের স্থানীয় সীমার মধ্যে ওইসব বা এর যে কোনো ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষমতা দান করতে পারবেন। এই অনুচ্ছেদটিও রায়ে বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি ফারাহ মাহবুব পৌনে দুই ঘণ্টাব্যাপী এ রায় ঘোষণা করেন।

২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট হাইকোর্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী কেন অবৈধ হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন। সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারসহ অন্যদের রিট আবেদনের শুনানি নিয়ে আদালত এ রুল জারি করেন। পরে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার রুলে পক্ষভুক্ত হন। এছাড়া ইনসানিয়াত বিপ্লব, গণফোরাম ও চার আবেদনকারী রুলে ইন্টারভেনর হিসেবে পক্ষভুক্ত হন।

২০১১ সালের ৩০ জুন জাতীয় সংসদে পঞ্চদশ সংশোধনী পাস হয়। এই সংশোধনীর মাধ্যমে শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির জনক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এই সংশোধনীর দ্বারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়। এছাড়া জাতীয় সংসদে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন সংখ্যা বিদ্যমান ৪৫-এর স্থলে ৫০ করা হয়। এ ছাড়াও বেশকিছু বিষয়ে সংশোধনী আনা হয়েছিল।

শেয়ার করুন