ফ্রান্স-মরক্কো ম্যাচে রেকর্ডের ছড়াছড়ি, সেমিতে ফরাসিরা

প্রকাশ:

সবশেষ দুই বিশ্বকাপের ফাইনালিস্ট ফ্রান্স দারুণ ছন্দময় ফুটবলে এবার ‘আটলাস লায়ন্স’খ্যাত মরক্কোকে ২-০ গোলে বিদায় করে এবারের আসরের সেমিফাইনালে উঠেছে। এই হাইভোল্টেজ ম্যাচে অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে ও ওসমান দেম্বেলে একটি করে গোল করেন। ফ্রান্সের এই জয়ে ফুটবল ইতিহাসের পাতায় যুক্ত হয়েছে বেশকিছু অবিশ্বাস্য রেকর্ড ও পরিসংখ্যান।

এই বিশ্বকাপে কিলিয়ান এমবাপ্পের গোলসংখ্যা এখন ৮। আর্জেন্টাইন মহাতারকা লিওনেল মেসির সমান ৮টি গোল করলেও অ্যাসিস্টের সংখ্যায় এগিয়ে থাকায় (এমবাপ্পে ৩, মেসি ১) গোল্ডেন বুটের দৌড়ে এখন সবার শীর্ষে এমবাপ্পে। বিশ্বকাপে এমবাপ্পে এখন পর্যন্ত ৮টি ম্যাচে জয়সূচক গোল করেছেন, যা ফুটবল ইতিহাসে এককভাবে সর্বোচ্চ। ১৯৬৬ সালের পর প্রথম ফুটবলার হিসেবে দুটি ভিন্ন বিশ্বকাপে ১০ বা তার বেশি গোলে অবদান রাখলেন এমবাপ্পে। ২০২২ আসরে তার অবদান ছিল ১০টি আর ২০২৬ বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত তার অবদান ১১টি। ২০২৬ বিশ্বকাপে এমবাপ্পের ১১টি গোলে অবদান (গোল+অ্যাসিস্ট) রয়েছে, যা ১৯৭০ সালে গার্ড মুলারের ১৩টির পর এক আসরে সর্বোচ্চ। গোল ও অ্যাসিস্ট মিলিয়ে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে এমবাপ্পের মোট গোলে অবদান এখন ১৪টি, গত ৬০ বছরে যা মেসির সঙ্গে যৌথভাবে সর্বোচ্চ।

একই ম্যাচে গোল ও অ্যাসিস্ট করার কীর্তি এটি তৃতীয়বারের মতো গড়লেন এমবাপ্পে। গত ৬০ বছরে তার চেয়ে বেশি (পাঁচবার) এমন কীর্তি আছে শুধু মেসির। গত ৬০ বছরে বিশ্বকাপের এক ম্যাচে গোল, অ্যাসিস্ট ও পেনাল্টি মিস করার ঘটনা ঘটেছে মাত্র চারবার। এর মধ্যে শেষ তিন দিনের মধ্যেই ঘটেছে দুটি; মিসরের বিপক্ষে লিওনেল মেসি এবং মরক্কোর বিপক্ষে কিলিয়ান এমবাপ্পে অদ্ভুত এ রেকর্ডের মুখোমুখি হন। ফ্রান্সের হয়ে টানা ১৫টি পেনাল্টি সফলভাবে রূপান্তর করার পর এবারই প্রথমবার ব্যর্থ হলেন এমবাপ্পে। এর আগে সবশেষ ফ্রান্সের জার্সিতে তার পেনাল্টি মিস ছিল ইউরো ২০২০-এ সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে টাইব্রেকারে। দিদিয়ের দেশমের অধীন এটি এমবাপ্পের ২০তম বিশ্বকাপ ম্যাচ, একই কোচের অধীন কোনো খেলোয়াড়ের জন্য যা সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলার রেকর্ড। বিশ্বকাপে এমবাপ্পের ক্যারিয়ার গোলসংখ্যা এখন ২০, যা ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। তার উপরে আছেন শুধু লিওনেল মেসি (২১)। ফ্রান্স জাতীয় দলের হয়ে ১০০ বা তার বেশি গোলে অবদান রাখা প্রথম ফুটবলার হলেন এমবাপ্পে। আন্তর্জাতিক ফুটবলে এখন পর্যন্ত তার অবদান ১০১টি, যার মধ্যে রয়েছে ৬৪টি গোল এবং ৩৭টি অ্যাসিস্ট।

প্রথমার্ধে পেনাল্টি পেয়েছিল ফ্রান্স। তবে স্পটকিকে নেওয়া এমবাপ্পের দুর্বল শটটি ঠেকিয়ে দেন মরক্কোর গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনো। এই সেভের মাধ্যমে ১৯৬৬ সালের পর (টাইব্রেকারসহ) বিশ্বকাপে যৌথভাবে সর্বোচ্চ চারটি পেনাল্টি সেভের কীর্তি এখন বুনোর দখলে।

টানা তৃতীয় বিশ্বকাপের (২০১৮, ২০২২ ও ২০২৬) সেমিফাইনালে উঠল ফ্রান্স। ফুটবল ইতিহাসে জার্মানি (২০০২-২০১৪ পর্যন্ত টানা চারবার এবং ১৯৮২-১৯৯০ পর্যন্ত টানা তিনবার) ও ব্রাজিলের (১৯৯৪-২০০২ পর্যন্ত টানা তিনবার) পর তৃতীয় দল হিসেবে এ গৌরবময় কীর্তি গড়ল ফরাসিরা। একই সঙ্গে এটি ফ্রান্সের অষ্টম বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল, যা ব্রাজিলের সমান দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। তাদের উপরে আছে শুধু জার্মানি (১২)। আর্জেন্টাইন রেফারিদের পরিচালনায় বিশ্বকাপে নিজেদের ষষ্ঠ ম্যাচ জিতেছে ফ্রান্স। ইতিহাসে কোনো দেশের জন্য এটাই সর্বোচ্চ জয়ের রেকর্ড। বিশ্বকাপে ফ্রান্সের মোট জয়ের সংখ্যা এখন ৪৫, যা ইতালির সমান যৌথভাবে চতুর্থ সর্বোচ্চ। জয়ের তালিকায় তাদের উপরে রয়েছে ব্রাজিল (৭৯), জার্মানি (৭০) এবং আর্জেন্টিনা (৫২)।

ওসমান দেম্বেলে তার বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারের পঞ্চম গোলটি করলেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, তার এই ৫ গোলই এসেছে ২০২৬ বিশ্বকাপে। এর আগের ২০১৮ ও ২০২২ আসরে তিনি কোনো গোল করতে পারেননি।

এমবাপ্পের ৮ গোল এবং দেম্বেলের ৫ গোল—একই বিশ্বকাপে পাঁচ বা তার বেশি গোল করা সতীর্থ জুটির মধ্যে এটি ২০০২ সালের পর প্রথম ঘটনা। ওই আসরে ব্রাজিলের রোনালদো (৮) এবং রিভালদো (৫) একই কীর্তি গড়েছিলেন। এবারের বিশ্বকাপে এমবাপ্পে, দেম্বেলে ও মাইকেল ওলিসে মিলে এখন পর্যন্ত ২৩টি গোলে অবদান রেখেছেন, যা ২০০২ সালে ব্রাজিলের বিশ্বকাপজয়ী ত্রয়ী রোনালদো, রিভালদো ও রোনালদিনহোর (২০) চেয়ে তিনটি বেশি।

১৮ বছর ২৮০ দিন বয়সে মরক্কোর আয়ুব বুয়াদ্দি বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনালে খেলা ইতিহাসের দ্বিতীয় কনিষ্ঠ ফুটবলার হিসেবে নাম লেখালেন। এ তালিকায় এখনো সর্বকনিষ্ঠ ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি পেলে, যিনি ১৯৫৮ সালে ওয়েলসের বিপক্ষে খেলেছিলেন মাত্র ১৭ বছর ২৩৯ দিন বয়সে।

মরক্কোকে বিদায় করে দিয়ে ফ্রান্স যেভাবে সেমিফাইনালে পা রাখল, তাতে কিলিয়ান এমবাপ্পের দল যে টানা দ্বিতীয়বারের মতো ট্রফি ঘরে তোলার জন্য মরিয়া, তা বলাই বাহুল্য!

শেয়ার করুন