বাংলাদেশের আপত্তি সত্ত্বেও ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নয়া দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখার সুযোগ দেওয়া হয়েছে, এই অভিযোগ তুলেছে ঢাকা। গত ৫ আগস্টের ওই সংবাদ সম্মেলনের ঘটনা দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টায় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে কিনা এবং সম্পর্কের টানাপোড়েন বেড়ে যেতে পারে কিনা—এসব প্রশ্ন এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। প্রায় দেড় হাজার মানুষ হত্যা এবং অসংখ্য মানুষকে স্থায়ীভাবে বিকলাঙ্গ করে দেওয়ার পরও শেখ হাসিনার মধ্যে কোনো অনুশোচনা নেই বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রতিবেশী দেশের আশ্রয়ে থেকে তার এমন দেশবিরোধী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রতিবারই প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ। ভারত সরকারকে অনুরোধও জানানো হয়েছিল, যেন পতিত স্বৈরাচারকে কোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং বক্তব্য থেকে বিরত রাখা হয়।
গত ৫ আগস্ট জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীর দিনে দেওয়া হাসিনার অডিও বক্তব্যের আগেও ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীকে সতর্ক করেছিলেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা শামা ওবায়েদও ভারত হাসিনাকে কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানোর সুযোগ দেবে না বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছিলেন। কিন্তু এসব সতর্কবার্তাকে উপেক্ষা করে ৫ আগস্ট ঠিকই ভারতে বসে কনফারেন্স করেন শেখ হাসিনা। দক্ষিণ এশিয়া ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব (এফসিসি সাউথ এশিয়া) আয়োজিত ওই সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনার পাশাপাশি তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নওফেল এবং আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি ও ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান যুক্ত ছিলেন।
ঘটনাটিকে ঘিরে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে ঢাকা। ওই রাতেই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কড়া ভাষায় এক বিবৃতিতে জানায়, মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বার্ষিকীর দিনে দিল্লিতে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়ায় বাংলাদেশ সরকার গভীর হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করছে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, অনুষ্ঠানটি আয়োজনের ফলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নতুন যাত্রার প্রচেষ্টায় সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে উদ্বেগ ভারত সরকারকে আগেই জানানো হয়েছিল। সরকারে থাকা বিএনপি নেতাদের অনেকেও ভারত সরকারের এই ভূমিকার সমালোচনা করেছেন।
সাবেক কূটনীতিক হুমায়ুন কবির মনে করেন, নয়া দিল্লিতে শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনের এই ঘটনায় দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের যে প্রচেষ্টা ছিল, সেটি আর অনুকূল ভূমিকা পালন করছে না। তবে আরেক সাবেক কূটনীতিক মুন্সি ফয়েজ আহমেদ বলেন, বাংলাদেশ সরকার ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এটি অপ্রয়োজনীয় একটি প্রতিক্রিয়া ছিল। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর তিনি দেশ থেকে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন। এরপর থেকে দুই দেশের সম্পর্ক অনেকটা শীতল হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে হাসিনাকে প্রত্যর্পণের জন্য ভারত সরকারকে ‘নোট ভারবাল’ পাঠিয়ে অনুরোধ করা হলেও ভারত ইতিবাচক কোনো জবাব দেয়নি।
তবে গত ১২ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার গঠনের পর দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নের প্রচেষ্টা দেখা যায়। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে ভারতের লোকসভা স্পিকার ওম বিড়লার উপস্থিতি এবং তার আগে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের ঢাকা সফর সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ইঙ্গিত দিয়েছিল। কিন্তু ভারতে থাকা শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ রাখা এবং তাকে দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে বিএনপি সরকারের অনুরোধের পরও ভারতের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে যে, তারা বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, ভারতের সঙ্গে আমাদের অনেক দ্বিপক্ষীয় ইস্যু আছে যা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে, তবে সিদ্ধান্তটা এখন ভারতকে নিতে হবে। ভারত সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, শেখ হাসিনার সেই অনুষ্ঠানের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই এবং তারা এই বক্তব্য সমর্থন করে না। তবে হুমায়ুন কবিরের মতে, ভারত সরকারের এই দায় না নেওয়ার বিষয়টি কোনো অর্থ বহন করে না।




