কক্সবাজারের চকরিয়া, মাতামুহুরী, পেকুয়া ও রামু উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা টানা পাঁচ দিনের ভারী বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। মাতামুহুরী ও বাঁকখালী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় অন্তত তিন লাখ মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন। বন্যার পাশাপাশি পাহাড়ধস ভয়াবহ রূপ নিয়েছে এবং গত চার দিনে জেলায় মোট ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে।
নিহতদের মধ্যে উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে ১৫ জন, কক্সবাজার শহরে দুইজন, চকরিয়ায় দুইজন এবং পেকুয়া, মহেশখালী ও কুতুবদিয়ায় একজন করে রয়েছেন। বৃহস্পতিবার দিয়াগত রাত দেড়টার দিকে চকরিয়ার বরইতলী ইউনিয়নের মোহছেনিয়াকাটা এলাকায় পাহাড়ধসে রুমি আক্তার (১৫) ও মোহাম্মদ তৌসিফ (১০) নামের দুই চাচাতো-জেঠাতো ভাইবোন প্রাণ হারিয়েছে। এ ঘটনায় আরও একজন আহত হয়ে চিকিৎসাধীন আছেন।
বন্যার পানিতে হাজারো বসতবাড়ি, কৃষিজমি, সবজিক্ষেত ও চিংড়ির ঘের তলিয়ে গেছে। সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। চকরিয়ার বরইতলী, বমুবিলছড়ি, কাকারা, লক্ষ্যারচর, চিরিঙ্গা ও হারবাং ইউনিয়ন এবং মাতামুহুরী উপজেলার পূর্ব বড়ভেওলা, ঢেমুশিয়া, কোনাখালী, বিএমচর ও সাহারবিল ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পেকুয়ার উজানটিয়া, মগনামা, বারবাকিয়া, মেহেরনামা ও পৌর এলাকাও বন্যাকবলিত। এছাড়া রামুর ঈদগড়, গর্জনিয়া, কচ্ছপিয়া, কাউয়ারখোপ, ফতেখাঁরকুল, রাজারকুল ও জোয়ারিয়ানালা ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে গেছে।
মাতামুহুরী ও পেকুয়ার কয়েকটি বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় নতুন নতুন এলাকায় পানি ঢুকছে। বিশেষ করে কোনাখালী ইউনিয়নের পুরুত্যাখালী ও মরণঘোনা এলাকায় বেড়িবাঁধ উপচে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করেছে। কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম জানান, বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টার পরিমাপ অনুযায়ী বাঁকখালী নদীর পানি ৫ দশমিক ৮৮ মিটার এবং মাতামুহুরী নদীর পানি ৬ দশমিক ৫৪ মিটারে পৌঁছেছে, যা বিপৎসীমার ওপরে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, টানা পাঁচ দিন সূর্যের দেখা নেই এবং ভারী বর্ষণে জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। কৃষকরা আমনের বীজতলা ও সবজিক্ষেত হারিয়ে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। অটোরিকশাচালক ও সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ আয়ের পথ হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের বারবাকিয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা খালেকুজ্জামান জানান, পাহাড়ধসের ঝুঁকি এড়াতে মাইকিং করে বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে সতর্ক করা হচ্ছে। জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানিয়েছেন, জেলার ৬৪৮টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। চকরিয়া ও মাতামুহুরীর ইউএনও শাহীদ দেলোয়ার জানিয়েছেন, পানি নিষ্কাশনের জন্য উপকূলীয় স্লুইস গেট খুলে দেওয়া হয়েছে।
কক্সবাজার আবহাওয়া অধিদপ্তরের সহকারী আবহাওয়াবিদ আব্দুল হান্নান জানান, গত পাঁচ দিনে জেলায় ৫৪৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে এবং ১১ জুলাই পর্যন্ত ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে। উত্তাল সাগরের কারণে টেকনাফ-সেন্টমার্টিন, কক্সবাজার-মহেশখালী এবং পেকুয়া-কুতুবদিয়া নৌপথে সাত দিন ধরে নৌযান চলাচল বন্ধ রয়েছে। এছাড়া উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে দুই শতাধিক পাহাড়ধসের ঘটনায় সামগ্রিক দুর্যোগ পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।





