জাপানে অনুষ্ঠিত এশিয়ান গেমসে সার্ফিংয়ের দ্বিতীয় রাউন্ডে জায়গা করে নিয়েছিলেন বাংলাদেশের নারী সার্ফার ফাতেমা আক্তার। তার এই অদম্য যাত্রাকে তুলে ধরতে কিশোর আলোর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ‘ফাতেমা: বিয়ন্ড দ্য ওয়েভস’ শিরোনামে একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রামাণ্যচিত্রটির পরিচালক আশিক ইব্রাহীম জানান, মূলত নারীদের সাহসিকতা, প্রতিকূলতা জয় করে নিজেদের অবস্থান তৈরি করা এবং স্বপ্ন পূরণের গল্পগুলো সামনে আনাই ছিল তাদের মূল উদ্দেশ্য। ফাতেমার লড়াইয়ের কথা শোনার পর তাকে নিয়ে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় দ্রুতই। কক্সবাজারের প্রতিনিধি আবদুল কুদ্দুস এবং ফাতেমার প্রশিক্ষক রাশেদ আলমের সহযোগিতায় শুটিংয়ের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়। ফোনে আগে কথা হয়েছে, তবে শুটিংয়ের আগের দিন কক্সবাজারে প্রথমবার সামনাসামনি ফাতেমার সঙ্গে দীর্ঘ আলাপ। শুটিংয়ের ফাঁকে ফাঁকে তার সঙ্গে কথা চলতে থাকে। ফাতেমা আক্তারের বাড়ি কক্সবাজারের মহেশখালী।
১৬ বছর বয়সী ফাতেমার সঙ্গে সরাসরি আলাপকালে তার আত্মবিশ্বাস বেশ মুগ্ধ করার মতো। নিজের জীবনের গল্প সে খুব সাবলীলভাবে বলতে পারে। শুটিংয়ের জন্য কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকতে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর পর তার জীবনের নানা দিক উন্মোচিত হয়—শৈশবের স্মৃতি, পরিবারের টানাপোড়েন, সার্ফিংয়ের হাতেখড়ি, অভাবের সঙ্গে লড়াই আর সামাজিক নানা বাধা। কক্সবাজারের মহেশখালীর বাসিন্দা ফাতেমা খুব ছোট বয়সেই পিতৃহীন হন। দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী হিসেবে পড়াশোনার পাশাপাশি সার্ফিংয়ে টিকে থাকাটা তার জন্য মোটেই সহজ ছিল না। ফাতেমা খাতুনের সম্পর্কে জানার পর তাই খুব বেশি ভাবতে হয়নি। ১৬ বছরের মেয়েটির কথায় আশ্চর্য আত্মবিশ্বাস। কোথাও বাড়তি আবেগ নেই, আবার নিজের লড়াই লুকিয়ে রাখার চেষ্টাও নেই। কয়েক মিনিট কথা বলার পরই মনে হয়েছিল, ক্যামেরার সামনে শুধু একজন সার্ফারকে পাওয়া যাবে না, পাওয়া যাবে নিজের ভবিষ্যৎ নিজেই ঠিক করতে চাওয়া এক কিশোরীর গল্প।
একসময় ফাতেমার সঙ্গে আরও অনেক কিশোরী সার্ফিং শিখতে এলেও সময়ের আবর্তে তারা ঝরে পড়েছে। পারিবারিক চাপ, অল্প বয়সে বিয়ে কিংবা সামাজিক রক্ষণশীলতার কারণে তারা আর সমুদ্রে ফিরতে পারেনি। তবে সেই সহপাঠীদের আক্ষেপের কথা ফাতেমার মনে এখনো গেঁথে আছে। তারা বিদায় নেওয়ার আগে ফাতেমাকে বারবার অনুরোধ করেছিল যেন সে সার্ফিং ছেড়ে না দেয়। সহপাঠীদের সেই অসমাপ্ত স্বপ্ন যেন ফাতেমা নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে। প্রতিকূল পরিস্থিতির মাঝে নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকার বিষয়ে ফাতেমা জানায়, সে কেবল নিজের মনের কথা শুনেছে।
সমুদ্রের ঢেউয়ের ওপর সার্ফিং করাটা দূর থেকে দেখতে সহজ মনে হলেও, এর নেপথ্যে রয়েছে কঠোর পরিশ্রম ও বারবার ব্যর্থ হয়ে উঠে দাঁড়ানোর গল্প। একটি ঢেউ ধরতে হলে ভারসাম্য বজায় রাখা, সঠিক সময়ে বোর্ডে ওঠা এবং পানির গতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে নিতে হয়। ফাতেমার জীবনটাও অনেকটা সেরকম। অভাব, সামাজিক বাধা এবং নারীদের জন্য তৈরি অদৃশ্য সীমানা বারবার তাকে দমিয়ে রাখতে চেয়েছে, কিন্তু প্রতিবারই সে দমে না গিয়ে আবার লড়াইয়ে ফিরেছে।
গত বছর ভারতের তামিলনাড়ুতে অনুষ্ঠিত এশিয়ান সার্ফিং চ্যাম্পিয়নশিপে ভালো পারফর্ম করার সুবাদে ফাতেমা প্রথমবারের মতো এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করার গৌরব অর্জন করে। কক্সবাজার থেকে জাপানের আইচি-নাগোয়ার মতো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পা রাখা শুধু একটি প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ নয়, বরং নিজের সামর্থ্য প্রমাণের বড় সুযোগ। তার এই সাফল্যের পেছনে উন্নত প্রশিক্ষণ, ভালো মানের সার্ফিং বোর্ড এবং নিয়মিত পৃষ্ঠপোষকতার প্রয়োজন রয়েছে। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় জয়-পরাজয়ের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, এত কম বয়সে ফাতেমা যে আত্মবিশ্বাস ও সাহসের পরিচয় দিয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে কক্সবাজার প্রতিবেদক আবদুল কুদ্দুসের সঙ্গে যোগাযোগ করি।
শুটিং শেষে দিনের আলো যখন ম্লান হয়ে আসছিল, তখনো ফাতেমাকে দেখা গিয়েছিল সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ের দিকে তাকিয়ে থাকতে। তার লক্ষ্য কেবল একজন ভালো সার্ফার হওয়া নয়, বরং পড়াশোনা চালিয়ে গিয়ে নিজের জন্য একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা। সে বিশ্বাস করে, সব বাধা পেরিয়ে একদিন ভালো কিছুই হবে। বাংলাদেশের নারী সার্ফিংকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত করার যে স্বপ্ন সে দেখছে, তাতে সে অন্যদের জন্যও অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।





