ঈদে মিলাদুন্নবী পালনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও বিবর্তনের ইতিহাস

প্রকাশ:

‘ঈদ’ শব্দের আভিধানিক অর্থ আনন্দ উদযাপন, ফিরে আসা বা খুশি হওয়া। অন্যদিকে ‘মিলাদ’ শব্দের অর্থ জন্মকাল বা জন্মদিন। এই দুইয়ের সমন্বয়ে ‘ঈদে মিলাদুন্নবী’ বলতে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আগমনকে কেন্দ্র করে আনন্দ উদযাপন বোঝায়। আরবের অন্ধকার ও সঙ্ঘাতময় সময়ে শান্তির বারতা নিয়ে আসা শেষ নবীর জীবনাদর্শ অনুসরণ করা প্রতিটি উম্মতে মুহাম্মদির অবশ্য কর্তব্য। সিরাতুন্নবী পালনের মাধ্যমে নবীজির সামগ্রিক জীবন-চরিত চর্চা করা হয়, যা ঈদে মিলাদুন্নবীর মূল উদ্দেশ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। যদিও এই উদযাপন নিয়ে মুসলিম উম্মাহর বিভিন্ন দল-উপদলের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে, তবে এটি ইসলামের কোনো ফরজিয়াতের তরক হওয়ার বিষয় নয়। এ ধরনের অহেতুক মতবিরোধ মুসলিম ভ্রাতৃত্ববোধে ফাটল ধরায়, যা ইসলামবিদ্বেষীদের সুযোগ করে দেয়।

ঐতিহাসিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, নবী (সা.)-এর যুগ, খোলাফায়ে রাশেদিন কিংবা তাবেয়ি ও তাবে-তাবেয়িদের সময়ে ঈদে মিলাদুন্নবী নামে কোনো উৎসবের প্রচলন ছিল না। জমহুর মুহাদ্দিসিনে কিরাম ও ঐতিহাসিকদের মতে, হিজরি চতুর্থ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে মিসরের ফাতেমীয় শাসক খলিফা মুয়িজলি দিনিল্লাহ সর্বপ্রথম নবী (সা.), হজরত আলী (রা.), হজরত ফাতিমা (রা.), ইমাম হাসান (রা.) ও ইমাম হুসাইন (রা.)-এর জন্মোৎসব পালনের প্রথা চালু করেন। আব্বাসীয় শাসনামলে ১৭৩ হিজরিতে বাদশাহ হারুনুর রশিদের মা খায়জুরান বিবি মদিনায় নবীজির রওজা জিয়ারতের পাশাপাশি মক্কায় নবীজির জন্মস্থানে দোয়া করার প্রথা চালু করেন এবং ১২ রবিউল আউয়ালে সেখানে আনন্দোৎসবের সূচনা করেন।

পরবর্তীতে আফজাল ইবনে আমিরুল জাইশ (৪৮৫-৫১৫ হিজরি) ক্ষমতায় এসে এই প্রথা বাতিল করলেও ৫১৫ হিজরিতে খলিফা আমির বিল আহকামিল্লাহ তা পুনরায় চালু করেন। তবে মিলাদুন্নবীর প্রকৃত উদ্ভাবক হিসেবে ইরাকের ইরবিল প্রদেশের শাসক আবু সাঈদ মুজাফফর উদ্দিন কুকুবুরিকে গণ্য করা হয়। তিনি ৬০৪ হিজরি থেকে সুন্নিসহ বিশ্বের অন্যান্য মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে বড় আকারে মিলাদ উদযাপনের প্রচলন করেন। স্পেনের আবুল খাত্তাব ওমর ইবনে হাসান ইবনে দেহিয়া আল কালবি মিলাদ নিয়ে সর্বপ্রথম ‘কিতাবুল তানভিল ফি মাউলিদিস সিরা-জিল মুনির’ নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন।

ভারতীয় উপমহাদেশে মিলাদুন্নবী প্রচলনের কৃতিত্ব মোগল শাসকদের। সম্রাট হুমায়ুন ও সম্রাট আকবরের অভিভাবক বৈরাম খাঁ উপমহাদেশে মিলাদ প্রচলন করেন। শেষ মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহের মাধ্যমে উপমহাদেশে সুন্নিদের মধ্যে মিলাদুন্নবীর প্রচলন সুসংহত হয়। বর্তমানে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম দেশে দিনটি সাড়ম্বরে পালিত হয় এবং বাংলাদেশে এটি সরকারি ছুটির দিন হিসেবে স্বীকৃত।

শেয়ার করুন