বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্কের বর্তমান সঙ্কটের প্রেক্ষাপটে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের ‘কমন গ্রাউন্ড’ বা অভিন্ন জায়গা খুঁজে বের করার বক্তব্যটি কেবল কূটনৈতিক সৌজন্য নয়, বরং এর গভীর তাৎপর্য রয়েছে। গত এক দশকের বেশি সময় ধরে বিদ্যমান রাজনৈতিক আস্থার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা সম্পর্কের কাঠামো ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর কার্যত ভেঙে পড়েছে। এখন দুই দেশের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, তারা পুরনো কাঠামো থেকে বেরিয়ে নতুন বাস্তবতার আলোকে একটি কার্যকর ‘পারস্পরিক স্বার্থের সমীকরণ’ তৈরি করতে পারবে কি না।
কূটনীতিতে ‘কমন গ্রাউন্ড’ বা অভিন্ন জায়গা খোঁজার অর্থ হলো, ভারত যেমন তার নিজস্ব নিরাপত্তা, উত্তর-পূর্বাঞ্চল, সীমান্ত, বাণিজ্য ও যোগাযোগকে গুরুত্ব দেবে, তেমনি বাংলাদেশকে তার পানি, সীমান্তে প্রাণহানি বন্ধ, বাণিজ্য ভারসাম্য, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক মর্যাদার মতো বিষয়গুলোকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। জয়শঙ্করের এই নীতিগত কাঠামোটি কোনো নির্দিষ্ট ইস্যুতে ভারতের একতরফা অবস্থান নয়, বরং প্রতিবেশী রাষ্ট্রের স্বার্থকে বিবেচনায় নেয়ার একটি ইঙ্গিত।
বর্তমানে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে দাঁড়িয়েছে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টি। এটি শুধু একটি আইনি ইস্যু নয়, বরং সার্বভৌমত্ব এবং নতুন বাংলাদেশের রাজনৈতিক বৈধতার সাথেও যুক্ত। অনানুষ্ঠানিক তথ্য অনুযায়ী, দিল্লি হাসিনার প্রত্যর্পণের ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড মওকুফ এবং গৃহবন্দী রাখার মতো শর্তের কথা বললেও, ’২৪-পরবর্তী বাস্তবতায় এ ধরনের সংবেদনশীল বিষয়ে দিল্লির চাহিদা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেয়ার পরিবেশ বর্তমান সরকারের সামনে কতটা আছে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। আবার অনেকে মনে করেন, শুধু হাসিনা ইস্যু নিয়ে পড়ে থাকলে বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে যে গুঞ্জন রয়েছে, সেটি দুই দেশের সম্পর্কের নতুন ভিত্তি নির্মাণের একটি বড় পরীক্ষা হতে পারে। তবে এই সফরের সাফল্য নির্ভর করবে আলোচনার এজেন্ডার ওপর। যদি পানি, সীমান্ত, বাণিজ্য, জ্বালানি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলোকে একটি সমন্বিত প্যাকেজের অংশ করা যায়, তবেই এটি নতুন পর্বের সূচনা করতে পারে। বাংলাদেশের উচিত ভারতের সাথে বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে নির্ভরতার বদলে পারস্পরিক সহযোগিতার নীতি অনুসরণ করা।
জয়শঙ্করের ‘ডি-রিস্কিং’ বা ঝুঁকি কমানোর দর্শনটি বাংলাদেশের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ। এর অর্থ হলো, কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়ে বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখা। একইভাবে ভারতের উচিত বাংলাদেশকে কেবল তার নিজস্ব নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ হিসেবে না দেখে একটি স্বাধীন প্রতিবেশী হিসেবে মূল্যায়ন করা। চীনের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ককে ভারতবিরোধী হিসেবে দেখার সুযোগ নেই, বরং বাংলাদেশ ও ভারত উভয়ই চীনের সাথে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার কৌশল গ্রহণ করতে পারে।
ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের বর্তমান আস্থার ঘাটতি দূর করতে কেবল শব্দ যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন বাস্তব পদক্ষেপ। সীমান্তে হত্যা বন্ধ, পানি সমস্যার সমাধান, বাণিজ্য বাধা দূরীকরণ এবং ভিসা ব্যবস্থা সহজ করার মতো বিষয়গুলোতে দৃশ্যমান অগ্রগতি ছাড়া ‘কমন গ্রাউন্ড’ কেবল একটি কূটনৈতিক বাক্য হিসেবেই থেকে যাবে। পরিশেষে, প্রতিবেশী পরিবর্তন করা সম্ভব নয়, তবে সম্পর্কের কাঠামো পরিবর্তন করে দুই দেশ তাদের স্বার্থকে সমন্বিত করার মাধ্যমে একটি টেকসই ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারে।





