অর্থবছর বদল: সংস্কার নাকি প্রশাসনিক ঝুঁকি?

প্রকাশ:

বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় ধরে ১ জুলাই থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত অর্থবছর অনুসৃত হয়ে আসছে। বর্তমানে এই সময়সীমা পরিবর্তন করে ১ এপ্রিল থেকে ৩১ মার্চ করার বিষয়ে যে আলোচনা চলছে, তা কেবল ক্যালেন্ডারের তারিখ পরিবর্তনের বিষয় নয়। এর সঙ্গে রাষ্ট্রের বাজেট প্রণয়ন, রাজস্ব আহরণ, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন, অডিট কার্যক্রম, ব্যাংকিং খাত এবং বাণিজ্যিক হিসাবরক্ষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কোনো যথাযথ বিশ্লেষণ বা প্রস্তুতি ছাড়া এমন একটি বড় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হলে তা অর্থনৈতিক সংস্কারের চেয়ে প্রশাসনিক ঝুঁকিই বেশি বাড়িয়ে তুলতে পারে।

মৌলিক প্রশ্ন হলো, বিদ্যমান কাঠামোর ঠিক কোন সমস্যাটি সমাধানের জন্য এই নতুন সময়সূচী প্রয়োজন? কেবল আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধানের যুক্তিতে এমন বড় নীতি পরিবর্তন করা কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। বর্তমানে দেশের অর্থনীতি নানামুখী চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে সরকারি বাজেট বাস্তবায়নের হার ছিল প্রায় ৬০ শতাংশ এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হার ছিল মাত্র ৪০.৭ শতাংশ। বিদ্যমান কাঠামাতেই যেখানে উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়নে বড় ঘাটতি রয়েছে, সেখানে নতুন সময়সূচী কার্যকর করা হলে তা বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

এই পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসতে পারে অন্তর্বর্তীকালীন বা 'ট্রানজিশনাল' সময়ে। পুরনো কাঠামো থেকে নতুন কাঠামোয় উত্তরণের জন্য ৯ মাসের একটি হিসাব সমন্বয় করতে হবে। এই ক্রান্তিকালে রাজস্ব আদায়, বাজেট ঘাটতি, কর নির্ধারণ, অবচয় (depreciation) এবং করপোরেট মুনাফার হিসাব কীভাবে পরিচালিত হবে, তা এখনো অস্পষ্ট।

অর্থবছর পরিবর্তনের প্রভাবগুলো বহুমুখী। করবর্ষ, আয়কর ও ভ্যাট রিটার্নের সময়সূচী পুনর্নির্ধারণ না করা হলে রাজস্ব প্রশাসনে বিভ্রান্তি ও অস্থিরতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ব্যাংকিং ও করপোরেট খাতেও বড় প্রভাব পড়বে, কারণ অধিকাংশ নিবন্ধিত কোম্পানি ৩০ জুন বা ৩১ ডিসেম্বরে তাদের আর্থিক বছর শেষ করে। সরকারি অর্থবছর পরিবর্তিত হলে আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি, নিরীক্ষা (audit) এবং রেগুলেটরি কমপ্লায়েন্সের খরচ বহুগুণ বেড়ে যাবে। এছাড়া জিডিপি প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি ও ব্যালেন্স অব পেমেন্টসের মতো সামঞ্জস্যপূর্ণ সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচকের ঐতিহাসিক তথ্যের ধারাবাহিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বাংলাদেশের কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতি আমন-বোরো চক্রের মতো মৌসুমের ওপর নির্ভরশীল, তাই প্রস্তাবিত সময়কাল এই প্রাকৃতিক উৎপাদন চক্রের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা ভেবে দেখা জরুরি।

অর্থবছর রূপান্তর কোনো সাধারণ হিসাবসংক্রান্ত বিষয় নয়; এটি পুরো সরকারি ও বেসরকারি অর্থনৈতিক কাঠামোর পুনর্বিন্যাস। তাই জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বাংলাদেশ ব্যাংক, বিএসইসি, আইসিএবি এবং ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর সঙ্গে সমন্বিতভাবে একটি স্বাধীন ‘ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট’ বা প্রভাব বিশ্লেষণ করা অপরিহার্য। সংস্কার অবশ্যই প্রয়োজন, তবে তা হতে হবে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা ও উত্তরণ রূপরেখা (transition roadmap) সহ। কেন পরিবর্তন করা হচ্ছে, এর সুফল কী, ব্যয় কত এবং ঝুঁকির দায়ভার কার—এই প্রশ্নগুলোর স্পষ্ট উত্তর ছাড়া সিদ্ধান্ত নিলে তা সংস্কারের বদলে অনিশ্চয়তা বাড়াবে।

শেয়ার করুন