সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সামরিক জোট ‘মক্কা চুক্তি’-তে যুক্ত হওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশের আগ্রহ দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্রনীতিকে বড় ধরনের পরীক্ষায় ফেলতে পারে বলে মনে করছেন ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, এই পদক্ষেপে কেবল ভারতের সঙ্গেই নয়, অন্যান্য বৃহৎ পরাশক্তির সঙ্গেও বাংলাদেশের সম্পর্কের সমীকরণ জটিল হয়ে উঠতে পারে।
সোমবার পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবীর ওই জোটে যোগ দেওয়ার বিষয়ে সরকারের ইতিবাচক মনোভাবের কথা জানানোর পর বিষয়টি নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত হয়। প্রতিমন্ত্রী সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বলেন, “আমরা মক্কা নিয়ে তো সবসময় আলাদা একটা জায়গা, বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে, পশ্চিম এশিয়ায় একটা যদি হয়, যদি ইসলামিক দেশগুলোর মধ্যে একটা নিরাপত্তা চুক্তি হয়, তাহলে ওখানে তো অস্বাভাবিক না যাওয়া। দেখা যাক, বিষয়টি ইতিবাচকভাবে দেখা হচ্ছে।”
গত ৭ আগস্ট সৌদি আরবের পবিত্র নগরী মক্কায় সুন্নি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ তিন দেশ—সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান—এই চুক্তিতে সই করে। নেটোর যৌথ প্রতিরক্ষা নীতির আদলে তৈরি এই চুক্তির আওতায় কোনো সদস্য দেশে সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে সব সদস্যের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। পশ্চিম এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র-ইর বর্তমান অস্থিরতা এবং ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের হামলার প্রেক্ষাপটে এই জোট গঠিত হয়েছে। তুরস্ক জানিয়েছে, চুক্তিটি অন্য দেশের জন্যও উন্মুক্ত।
রয়টার্সের একটি বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিষয়টি কেবল একটি নতুন নিরাপত্তা জোটে অংশ নেওয়ার প্রশ্ন নয়; বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে এর সামঞ্জস্য, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক এবং দেশের রপ্তানি ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়েও সরকারকে ভাবতে হবে। বাংলাদেশ মূলত বিনিয়োগ আকর্ষণ, রপ্তানি বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন শক্তিশালী দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখার স্বার্থে প্রতিদ্বন্দ্বী ভূ-রাজনৈতিক বলয় এড়িয়ে চলার নীতি মেনে চলে।
ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক কল্লোল কিবরিয়ার মতে, আনুষ্ঠানিকভাবে এমন কোনো সামরিক জোটের সদস্য হলে তা চীন, ইরান, জাপান, কুয়েত, ওমান, কাতার, রাশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ককে জটিল করে তুলতে পারে। তিনি বলেন, “সম্পর্কগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভেঙে যাবে না ঠিকই, কিন্তু বাংলাদেশ একবার কোনো সামরিক ব্লকে যোগ দিলে, তারা কোন পক্ষে আছে—সেই প্রশ্নটি এড়ানো তখন অনেক কঠিন হয়ে পড়বে।”
বিশ্লেষকদের আরেকটি বড় উদ্বেগ ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের টানাপড়েন নিয়ে। ভারত দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত এবং তারা এই নিরাপত্তা জোটে বাংলাদেশের যোগ দেওয়ার বিষয়টিকে সহজভাবে নাও নিতে পারে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, কোনো নির্দিষ্ট বলয়ে যুক্ত হওয়ার ধারণা বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
মক্কা চুক্তি নিয়ে আলোচনার মধ্যেই ২৭ আগস্ট জেদ্দায় অনুষ্ঠেয় ওআইসির মন্ত্রী পর্যায়ের জরুরি সভায় যোগ দিতে যাচ্ছেন প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবীর। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানিয়েছেন, তারা পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। শেষ পর্যন্ত এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব বিবেচনায় নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
শেখ হাসিনা গত ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে এক সংবাদ সম্মেলনে অডিও কলে যুক্ত হয়ে বক্তব্য দেওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখায়।





