ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ান বোনাপার্টের বিখ্যাত উক্তি, “আমাকে একজন শিক্ষিত মা দাও, আমি একটি শিক্ষিত জাতি উপহার দেবো” – এই বাক্যটি আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় ‘শিক্ষিত মা’র সংজ্ঞা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। একজন মা কি কেবল তিনিই, যিনি নিজে জিপিএ ৫ অর্জন করেছেন এবং সন্তানকেও জিপিএ ৫ পাওয়ানোর জন্য ‘রেসের ঘোড়ার’ মতো খাটান? নাকি যিনি নিজের শিক্ষাজীবনের ব্যর্থতার ভার সন্তানের কাঁধে চাপিয়ে দেন, তিনিই শিক্ষিত মা? এই সংজ্ঞাটি নেপোলিয়ান পরিষ্কার করে গেলে হয়তো আজকের মায়েরা সন্তানের শিক্ষার জন্য এমন ‘যুদ্ধে’ নামতেন না।
বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় শিশুরা কাঁধে একগাদা বই নিয়ে ‘গাধার খাটুনি’ খাটে। ভোর না হতেই শুরু হয় দৌড়, স্কুল শুরুর আগে একদফা ‘প্রাইভেট’, তারপর স্কুল। ক্লাস শেষে স্কুলেই থাকে বিশেষ কোচিংয়ের ব্যবস্থা, এরপর আবার ‘ব্যক্তিগত’ বা প্রাইভেট। যদি ব্যক্তিগত চেষ্টাতেই সব শিখতে হয়, তাহলে শিশুদের স্কুলে পাঠানোর প্রয়োজন কী, এমন প্রশ্নও উঠছে। স্কুল থেকে শিশুরা মূলত ভালো নম্বর পাওয়া, ক্লাসে প্রথম হওয়া এবং এসএসসি ও এইচএসসিতে জিপিএ ৫ অর্জনের শিক্ষাই পাচ্ছে। এর জন্য ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বই কাঁধে নিয়ে ‘গাধার মতো’ খাটতে পারলেই নাকি পড়ালেখা হয়ে যায়।
কিন্তু দুটি সোনালি জিপিএ ৫ অর্জন করে শিক্ষার্থীরা কী পাচ্ছে? এই ‘সোনালি চাবি’ কি তাদের ক্যারিয়ার গড়ে দিতে পারছে? অনেকের ক্ষেত্রে পারলেও, অনেকের জীবনে এটি হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। জিপিএ ৫-এর পেছনে ছুটতে গিয়ে শিক্ষার্থীরা ক্লান্ত হয়ে পড়ছে, যার ছাপ সম্প্রতি এইচএসসি পরীক্ষায় স্পষ্ট দেখা গেছে। পরীক্ষা শুরুর প্রথম দিনে অনুপস্থিত ছিল ২৪ হাজার ৭৮৪ জন পরীক্ষার্থী, যা গত বছর ছিল ১৯ হাজার ৭৫৯ জন এবং তার আগের বছর ১৫ হাজার ২০৩ জন। ২০২৩ সালে এই সংখ্যা ছিল ৫ হাজার ৫২২ জন। বছর বছর অনুপস্থিতির এই সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। শুধু তাই নয়, এই বছর নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৩৬ শতাংশ ফরম ফিলাপই করেনি, যা প্রতি বছর বাড়ছে।
একটি সহযোগী দৈনিকের বিশেষ প্রতিবেদনে একজন অধ্যাপক এই পরিস্থিতি গভীরভাবে খতিয়ে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, এটি কি আমাদের লেখাপড়ার পদ্ধতির দুর্বলতা, নাকি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার দুর্বলতা? শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে যায় পড়াশোনা করতে, তাই তাদের পড়াশোনায় সবল করে তোলার দায়িত্ব শিক্ষকদের। তবে পরিবারের, বিশেষ করে মায়ের দায়িত্বই এখানে সবচেয়ে বড়।
শহুরে একশ্রেণির মা আছেন যারা সন্তানের দেখাশোনার জন্য লোক রাখেন, নিজেরা পরিপাটি থাকেন এবং বিলাসিতায় মজে থাকেন। তারা যখন কাজে ব্যস্ত না থাকেন, তখন ‘পার্টি’ করতে যান। তাদের সন্তানরা ইংরেজি মিডিয়ামে পড়ে এবং বাবা-মায়ের টাকার জোরে তাদের পড়ালেখা চলে। এই টাকার জোরে হয়তো তাদের ক্যারিয়ার গড়ে ওঠে, আবার টাকার জোরেই তারা বখে যায়। অন্যদিকে, গ্রামের মায়েরা ভোরে উঠে ধান শুকান, পাটের আঁশ ছাড়ান, রোদ-বৃষ্টিতে খেটে সংসারের ঘানি টানেন। তারা সন্তানের লেখাপড়ার গুরুত্ব বোঝেন এবং সন্তানকে বড় অফিসার বা বড় চাকরিজীবী হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে স্কুলে পাঠান। কিন্তু তারা সন্তানদের ঠিকমতো খেতে-পরতে দিতে বা পরিচর্যা করতে পারেন না। ক্ষুধার্ত পেটে শিশুরা কতটুকু শিখতে পারে, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
মায়ের কাছ থেকে সন্তানের সবচেয়ে বড় মানসিক অনুপ্রেরণা পাওয়ার কথা। কিন্তু মা যখন ক্লান্ত থাকেন, সন্তানের হতাশা বোঝার ক্ষমতা তার থাকে না। এরপর সন্তানের পড়ালেখা ড্রপ হওয়ার খবর শুনে মা-বাবা আকাশ থেকে পড়েন। এমনকি যারা জিপিএ ৫-এর ‘চাবুক’ হাতে সন্তানকে তাড়িয়ে বেড়ান, তাদের সন্তানদেরও ড্রপ হয়। কখনো কখনো পরীক্ষার নম্বর দেখে তা বোঝা না গেলেও, তাদের সন্তানদের বড় রকমের মানসিক ড্রপ হয়ে যায়, যা কাটিয়ে ওঠা আর সম্ভব হয় না।
মাধ্যমিক পার হয়ে উচ্চমাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থীরা মানসিকভাবে সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে থাকে। এটি দোলাচলের সময়, যখন কারো ভেতর বিশ্বজয়ের স্বপ্ন থাকে, আবার কারো ভেতর বাসা বাঁধে হতাশা। এই সময়ে ধান শুকানো মায়ের সন্তান পড়ালেখার খরচ জোগাতে পারে না, আর পার্টিতে যাওয়া মায়ের বখে যাওয়া সন্তানের কাছে এইচএসসি পরীক্ষা ‘পুলসিরাতের’ মতো হয়ে দাঁড়ায়। যারা নিজেদের চেষ্টায় সৃজনশীল হয়ে ওঠে, তারা মুখস্থনির্ভর ও গতানুগতিক শিক্ষাব্যবস্থার ধকল টানতে পারে না। এই টালমাটাল সময়ে ডিগ্রি অর্জনের আরও অনেক পথ বাকি থাকে। এইচএসসি পাসের পর অনার্স (পাসকোর্স মূল্যহীন) এবং তারপর মাস্টার্স – এরপর কী হবে, সেই হিসাব তাদের সামনে থাকে না।
শিক্ষার্থীদের একটি স্বপ্ন থাকে, কিন্তু সেই স্বপ্নপূরণে ঠিক কী করতে হবে, তা তারা জানে না। যেমন, কেউ হয়তো ইঞ্জিনিয়ার হতে চায়, প্রযুক্তিতে ঝোঁক আছে এবং দেশ-বিদেশের নানা খবরের খোঁজ রাখে। ইঞ্জিনিয়ার হতে হলে তাকে গণিত ও পদার্থবিদ্যা ভালো করে আয়ত্ত করতে হবে, কিন্তু সে গণিতে কাঁচা এবং গত বছর পদার্থবিদ্যায় একশতে ২৬ নম্বর পেয়েছে। ফলে তার ইঞ্জিনিয়ার হয়ে ওঠা হয় না। অথচ কেবল ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্নই তাকে একজন ডাকসাইটে ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারত, যদি তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আনন্দের সাথে পড়ানো হতো এবং পদার্থবিদ্যার প্রথম ক্লাসটি একটি পরিপূর্ণ ল্যাবরেটরিতে হতো। তখন শুরু থেকেই সে পদার্থবিদ্যার প্রয়োগ কোথায় কোথায় হয়, তা বুঝে যেত। এমনও হতে পারত, স্কুলে পড়তে পড়তেই সে একজন বিজ্ঞানী হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়ে যেত।
আমাদের দেশে এখন বিজ্ঞানী হতে পারছে কয়জন? যাদের নাম শোনা যায়, তারা বাংলাদেশী হলেও বিজ্ঞানী হওয়ার পরিবেশ পেয়েছে উন্নত দেশে গিয়ে। আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার পরিবেশ নেই, জ্ঞান সৃষ্টির তাড়া নেই। কেবল নতুন করে পুরনোর জাবর কেটে দায় সারা হচ্ছে। এখানে পড়ালেখা শেষ করে অনেককে বেকার হতে হয়। যাদের ভাগ্য ভালো, তাদের কেউ সুকর্মে ঢুকতে পারেন। কর্মের শিক্ষাটা শিক্ষাজীবনে থাকে না। প্রকৃত কর্মমুখী ও কারিগরি শিক্ষার ওপর আমাদের গুরুত্ব কম। তবে কেবল কর্মমুখী শিক্ষায় নির্ভর হয়ে গেলে সমাজ ও রাষ্ট্র সংকটে পড়বে, কারণ যাদের বুকে কবিতা থাকে না, তাদের মগজে দর্শনও থাকে না। আমাদের দরকার একটি সমন্বিত শিক্ষাব্যবস্থা, যেখানে সাধারণ ও সামাজিক শিক্ষাকে কর্মমুখী উপাদানে সমৃদ্ধ করা হবে। এতে ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান ও সাহিত্যের শিক্ষার্থীদের কেবল শিক্ষক হওয়ার আশায় থাকতে হবে না, অন্য কোনো উপায়েও তারা নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে।





