১৪ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভালোবাসাই যখন ধর্ম হয়ে ওঠে, ঈশ্বরের নাম হয় ডিয়েগো

প্রকাশ:

রোজারিওর লা তাবলাদা মফস্‌সল শহর। ঘড়িতে তখন রাত ১২টা বেজে ১৫ মিনিট। এরনান আমেজ একটু উদ্দেশ্যহীন নিশুতিরাতের পায়চারি আরকি করতে বের হয়েছিলেন। পথিমধ্যে দেখা হলো বন্ধু হেক্টর ক্যাম্পোমারের সঙ্গে। বন্ধুকে তো কুশলাদি জিজ্ঞেস করতেই হয়। হেক্টরকে দেখেই এরনান বলে উঠলেন, ‘এই তো হেক্টর…চলে যাচ্ছে আরকি…শুভ বড়দিন (মেরি ক্রিসমাস)।’ হেক্টর তো অবাক! এখন বড়দিন কেন? তিনি বিচলিত হয়ে জানতে চাইলেন, ‘মানে কী?’ এরনানের কণ্ঠ ছিল একদম দ্বিধাহীন, ‘শুভ বড়দিন। একটু ভাবো, বুঝতে পারবে।’ হেক্টরের এবার হঠাৎ মনে পড়ল, ‘ঠিক বলেছ! শুভ বড়দিন।’ দুই বন্ধু একে অপরকে আলিঙ্গন করে শুভরাত্রি জানিয়ে পথ ধরলেন। একটু অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশে গা ছমছমে অনুভূতি। বলটিকে দেখে মনে হয় অত্যাচারে জর্জরিত।

লা তাবলাদা থেকে কয়েক ব্লক দূরে লা গুয়ার্দিয়ায় ফোন বাজছে আলেহান্দ্রো ভেরনের ঘরে। ফোনটা ধরতেই ওপাশ থেকে এরনান বললেন, ‘হ্যালো অ্যালে, এরনান বলছি। শুভ বড়দিন।’ আলেহান্দ্রো কিছুটা বিরক্ত হয়েই উত্তর দিলেন, ‘এখন রাত (প্রায়) ১টা বাজে। কী খেয়েছ? ফরমালডিহাইড?’ এরনান বললেন, ‘একটু ভেবে দেখো। আজ কোন দিন, অ্যালে?’ আলেহান্দ্রো একটু ভেবেই বলে উঠলেন, ‘হ্যাঁ, ঠিকই বলেছ। আজ “ঈশ্বর”–এর জন্মদিন। শুভ বড়দিন, ভাই মারাদোনিয়ান।’ শত শত ‘মারাদোনিয়ান’ সমবেত হয়ে এক সুরে পাঠ করছিলেন তাঁদের নিজস্ব আঙ্গিকে বানানো প্রার্থনা, যেটা শুনলে খ্রিষ্টধর্মের প্রার্থনার সঙ্গে কিছুটা মিল পেতে পারেন। আর বলের ওপরিভাগে তার দিয়ে বানানো কাঁটার মুকুট বসানো (ঠিক ধরেছেন, যিশুখ্রিষ্টের মতো)।

পরের দিন সন্ধ্যায় তিন বন্ধু মিলে বিয়ারের ক্যান খুলে উদ্‌যাপন করলেন প্রথম ‘মারাদোনিয়ান ক্রিসমাস’। ১৯৯৮ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত এই তিন বন্ধু এভাবেই ছোট পরিসরে দিনটি উদ্‌যাপন করেছিলেন। কিন্তু ২০০১ সালে ব্যাপারটা একটু পাল্টে গেল। সেবার একটু আগেভাগেই (৭ অক্টোবর) প্রস্তুতি নিলেন এরনান ও আলেহান্দ্রো। সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো যাঁরা আসবেন এই নিমন্ত্রণে, তাঁদের ‘মারাদোনিয়ান’ বলা হবে। আরও কিছু বন্ধুবান্ধব যোগ দিল তাঁদের উদ্‌যাপনে। কিন্তু ভেরনের এই কথাগুলো এল গ্রাফিকোয় যেদিন (২০২০ সালের ২৫ নভেম্বর) প্রকাশিত হলো, সেদিন আর তিনি এই মর্ত্যে নেই।

ডিনারে উপস্থিত হলেন ১২০ জন ম্যারাডোনা–ভক্ত। অনেকটাই ধর্মসভার আঙ্গিকে সেই অনুষ্ঠানে হঠাৎ করেই পাদ্রির পোশাকে হাজির হলেন আলেহান্দ্রো ভেরন। সেই রাতে এরনান ও আলেহান্দ্রো অন্যদের বলে দেন, আগামী ১০ নভেম্বর বোকা জুনিয়র্সের মাঠ লা বোমবোনেরা স্টেডিয়ামে শেষ ম্যাচটি খেলবেন ম্যারাডোনা। এরপরই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ম্যারাডোনার ৫২ জন অনুসারী পৌঁছালেন বোকা জুনিয়র্সের স্টেডিয়ামে। তখন সকাল প্রায় সাড়ে ৯টা বাজে। ১২ নম্বর গেট দিয়ে অনুসারীরা ঢুকলেন তাঁদের ‘ঈশ্বর’কে দেখতে এবং সেখানে ১০ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৩ মিটার প্রস্থের একটি বিশালাকার পতাকা বের করলেন। ম্যারাডোনার শেষ ম্যাচ বলেই হয়তো সেদিন আকাশও কাঁদছিল। অনেকেই বিষয়টা বুঝতে পারেনি, বিশেষ করে ক্যাথলিক অনুসারীরা।

‘ইগলেসিয়া মারাদোনিয়া’ বা ডি১০এস ধর্মের উদ্ভব

ব্যস, এরপরই লিওনেল মেসির জন্মভূমি রোজারিওতে জন্ম হলো ‘মারাদোনিয়ান চার্চ’ এর, যা আসলে ম্যারাডোনার নামে চালু হওয়া একটি প্রাতিষ্ঠানিক উপাসনা কেন্দ্র। আর সেই উপাসনা ও স্তুতির ভিত হলো ‘ইগলেসিয়া মারাদোনিয়া’ বা ‘ডি১০এস’—যা ফুটবল কিংবদন্তির নামে চালু হওয়া ধর্মের নতুন নাম। তবে আরও একটু আনুষ্ঠানিকতা বাকি ছিল, যা সম্পন্ন হয়েছিল পরের বছর অর্থাৎ ২০০২ সালের ২২ জুন। আশপাশের এলাকা থেকে ম্যারাডোনার ভক্তদের নিয়ে একটি ডিনার অনুষ্ঠান আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হলো। সবার আগে অন্য একটি কৌতূহলের রহস্য ভাঙতে হয়। জন্মদিনে ম্যারাডোনা নিজেই রোজারিওতে তাঁর চার্চে ফোন করে অনুসারীদের শুভেচ্ছা জানাতেন। ছবির সেই মানুষকে উপাসনা (প্রশংসা, স্মরণ) করতে এসেছেন সবাই।

২২ জুন ১৯৮৬ সালে মেক্সিকোর আজতেকা স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে বিখ্যাত দুটি গোল করেছিলেন ম্যারাডোনা—যার একটি ‘হ্যান্ড অব গড’ এবং অপরটি শতকের সেরা গোল। সেই ঐতিহাসিক ম্যাচের ১৬ বছর পর একই দিনে, অর্থাৎ ২০০২ সালের ২২ জুন রোজারিওর সেজারিনি গ্রাউন্ডে জমায়েত হলেন ম্যারাডোনার ভক্তরা। সেখানে দুই বন্ধু মিলে যুক্তিতর্কের মাধ্যমে ঠিক করলেন, ‘ডিয়েগো যেহেতু ফুটবল–ঈশ্বর, তাই তাঁর নামে একটি চার্চ থাকা দরকার।’ যার ভালো লাগবে না, পাত্তা না দিলেই হয়।’। ম্যারাডোনার পরিবারকে ‘হলি ফ্যামিলি’ সম্বোধন করে শুরু করলেন স্তোত্রপাঠ, ‘তোতার (ম্যারাডোনার মা) নামে শুরু করছি…ডন ডিয়েগো…এবং তার ভালোবাসার মানুষেরা। মেক্সিকোর আজতেকা স্টেডিয়ামে সেদিন ’৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে দুটি গোল করেন ম্যারাডোনা।

তবে তখন প্রশ্ন উঠল, রক্তমাংসের এক মানুষকে রীতিমতো ‘ঈশ্বর’ (আর্জেন্টিনায় তারও বহু আগে থেকেই তিনি এই নামে স্বীকৃত) বানিয়ে তাঁর নামে চার্চ তৈরির অর্থ তো আসলে নতুন এক ধর্মের উদ্ভব ঘটানো। পাঁচ বছর আগে আর্জেন্টিনার অনলাইন সাময়িকী ‘এল গ্রাফিকো’কে এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে ভেরন বলেছিলেন, ‘শুরুতে আমাদের চার্চ বানানোর কোনো পরিকল্পনা ছিল না। কিন্তু আমরা উপলব্ধি করলাম, ডিয়েগোর অনুসারীর সংখ্যা অগণিত এবং তাঁদের সংগঠিত করার একটি স্থান প্রয়োজন।’ এলাকার ‘পাদ্রি আমাদের আস্ত রাখবে তো?’ ‘যে পছন্দ করবে ভালো। স্প্যানিশ ভাষায় ‘ডিআইওএস’ শব্দের অর্থ ‘সৃষ্টিকর্তা’। তাদের বোঝাতে কিছুটা সময় লেগেছিল যে আমাদের ধর্মটা আসলে খেলাধুলাকেন্দ্রিক এবং (প্রচলিত ধর্ম থেকে) একটু আলাদা।’। আমরা এখনো আশা হারাইনি যে কোনো এক দিন কেউ দরজায় কড়া নাড়বে, আর তিনি হবেন ডিয়েগো।’।

ভেরনের ভাষ্য মতে, ‘খ্রিষ্টানরা যেমন একত্র হয় এই বিশ্বাসে যে ঈশ্বর আকাশ থেকে তাঁদের দিকে তাকিয়ে আছেন, আমরাও তেমনি একত্র হই এটা অনুধাবন করে যে ফুটবলে আবেগ ও ভালোবাসার সবচেয়ে বড় প্রতীক ম্যারাডোনা। তিনি কোনো সন্ত বা সুপারহিরো নন, স্রেফ রক্তমাংসের একজন মানুষ, যিনি ফুটবলটা অন্যদের চেয়ে অসাধারণ খেলতেন।’

মারাদোনিয়ান ধর্মে দীক্ষার প্রক্রিয়া ও বিশ্বজুড়ে এর বিস্তার

‘ইগলেসিয়া মারাদোনা’ নামের এই ধর্মের উদ্ভবের সময় ম্যারাডোনা জীবিত ছিলেন। ২০০৮ সালে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানে আমেরিকান লেখক ও সাংবাদিক জোনাথন উইলসন রোজারিওতে গিয়ে সরেজমিনে দেখে এসেছিলেন কেউ ‘মারাদোনিয়ান’ ধর্মে দীক্ষিত হতে চাইলে সেই প্রক্রিয়াটা ঠিক কেমন হয়। ম্যারাডোনা তখন আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের কোচ হওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন।

উইলসন বর্ণনা করেন, সেখানে উপাসকেরা এত জোরে আওয়াজ করছিলেন যে বেদিতে দাঁড়ানো পাদরির কথা শুনতেই কষ্ট হচ্ছিল। প্রার্থনা শেষে আলো কমিয়ে আনা হলে এক আবেগঘন গা ছমছমে পরিবেশের সৃষ্টি হয়। সাদা আলখাল্লা পরা ছয়জন পাদ্রি মঞ্চে এসে অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। সেখানে এক ভক্তের টি–শার্টে লেখা ছিল, ‘পোপ তো রোমে থাকেন, কিন্তু ঈশ্বর থাকেন আর্জেন্টিনায়।’ প্রার্থনা শেষে কক্ষের আলোটা বেশ কমে এল। সাদা আলখাল্লা পরা ছয়জন ব্যক্তি (পিঠে ম্যারাডোনোর ১০ নম্বর) সবার সামনে এসে দাঁড়ালেন। অল্প বয়সী এক ছেলে এই ছয় পাদরির সামনে দাঁড়িয়ে তাঁদের সহকারীর ভূমিকায়।

মঞ্চ থেকে যখন নতুনদের দীক্ষা দেওয়ার জন্য ডাকা হয়, তখন নিয়ম অনুযায়ী হাত দিয়ে গোল করার সেই বিখ্যাত মুহূর্তের পুনর্নির্মাণ করতে হতো এবং বাইবেলে হাত রেখে শপথ নেওয়ার মতো ম্যারাডোনার আত্মজীবনী ‘এল ডিয়েগো’ স্পর্শ করে অনুসারী হিসেবে আনুগত্য স্বীকার করতে হতো। কুইজ প্রতিযোগিতায় ম্যারাডোনার জীবন সম্বন্ধীয় প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিয়ে ভক্তরা দীক্ষা লাভ করতেন। ২০২১ সালে মেক্সিক্যে এই চার্চের নতুন শাখা উদ্বোধনের সময় রয়টার্স জানিয়েছিল, বিশ্বজুড়ে মারাদোনিয়ান ধর্মের অনুসারী সংখ্যা বর্তমানে পাঁচ লাখের বেশি। পাশাপাশি ‘মারাদোনিয়ান ব্যাপ্টাইজড’ (ম্যারাডোনার ধর্মে দীক্ষা নেওয়া) হলেন ৪২ জন অনুসারী।

নোবেলজয়ী প্রখ্যাত লেখক মারিও ভার্গাস ইয়োসা ম্যারাডোনার এই জনপ্রিয়তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘মানুষের সমকালীন নায়কের প্রয়োজন পড়ে, যাকে সে পূজা করতে পারে। ম্যারাডোনা ছিলেন তেমনই এক লোকপ্রীতি ও আবেগের প্রতীক, যিনি সাধারণ মানুষকে ফুটবলের মাধ্যমে পরম আনন্দ উপহার দিয়েছিলেন।’

মারাদোনিয়ান চার্চের ১০টি আদেশনামা (১০ কমান্ডমেন্টস)

বাইবেলে যেমন ‘টেন কমান্ডমেন্টস’ রয়েছে, ঠিক তেমনই ‘ইগলেসিয়া মারাদোনিয়া’র অনুসারীরাও ১০টি বিশেষ আদেশনামা তৈরি করেছেন

  1. বলে কখনো কলঙ্কের দাগ লাগে না।
  2. ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা সবকিছুর ঊর্ধ্বে।
  3. ফুটবলের সৌন্দর্য ও ডিয়েগোকে নিঃশর্তভাবে ভালোবাসো।
  4. আর্জেন্টাইন জার্সির পক্ষে দাঁড়াও।
  5. গোটা পৃথিবীতে ডিয়েগোর অলৌকিকত্ব ছড়িয়ে দাও।
  6. সেই মন্দিরকে (স্টেডিয়াম) ভালোবাসো, যেখানে তিনি খেলেছেন এবং তাঁর জার্সিকে।
  7. ডিয়েগো কোনো নির্দিষ্ট একটি দলের নন।
  8. মারাদোনিয়ান চার্চের আদর্শ ছড়িয়ে দাও।
  9. তোমার নামের মাঝের অংশটুকু ‘ডিয়েগো’ রাখো।
  10. প্রথম সন্তানের নাম রাখো ডিয়েগো।
শেয়ার করুন