১৪ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিশ্বের শ্রমবাজারে দক্ষ কর্মী পাঠাতে মহাপরিকল্পনা সরকারের

প্রকাশ:

বৈশ্বিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য নতুন ও উন্নত সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে সরকার একটি সমন্বিত উদ্যোগ নিয়েছে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, সরকারের বর্তমান কৌশলের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো অপ্রথাগত আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের সম্ভাবনাগুলোকে কাজে লাগানো। এর মাধ্যমে আগামী পাঁচ বছরে এক কোটি দক্ষ কর্মী বিদেশে পাঠানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের এই সময়ে বৈদেশিক আয়ের ভিত্তি সুদৃঢ় করে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে গতিশীলতা আনাও সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। কর্মীদের দক্ষতা যেন আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়, সেজন্য বিভিন্ন দেশের স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের সাথে যৌথ সার্টিফিকেশন ও স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো ইউরোপের শ্রমবাজারে জনমিতিক পরিবর্তনজনিত শ্রমিক সংকট মোকাবিলায় নিরাপদ, নিয়মিত ও নথিভুক্ত পথে বাংলাদেশ থেকে দক্ষ তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবী, প্রকৌশলী ও কারিগরি কর্মী পাঠানো। আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের কর্মীদের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়াতে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ (টিভিইটি) পাঠ্যক্রমে বিদেশি ভাষা প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করার লক্ষ্যে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগও জোরদার করা হয়েছে।

এই মহাপরিকল্পনার লক্ষ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান, উচ্চ রেমিট্যান্স প্রবাহ নিশ্চিত করা, নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করে দালালদের দৌরাত্ম্য নির্মূল করা এবং প্রবাসীদের সম্মানজনক কর্মসংস্থান ও আইনি সুরক্ষা প্রদান করা। সরকার সম্মানজনক কর্মসংস্থান ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কর্মপরিবেশ ও আইনি ব্যবস্থাপনার মান কঠোরভাবে যাচাই করে কর্মী পাঠাতে চায়, যাতে প্রবাসীরা কর্মক্ষেত্রে শোষণমুক্ত ও মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশ পান। একই সঙ্গে অননুমোদিত মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ, অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ অনিয়মিত অভিবাসন প্রতিরোধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা কার্যকর করছে সরকার।

বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের প্রথাগত বাজারের বাইরে ইতালি, জার্মানি, গ্রিস ও রোমানিয়ার মতো ইউরোপীয় দেশ, জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে প্রবেশাধিকার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

দক্ষতা বৃদ্ধিতে দেশজুড়ে ১০৪টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে (টিটিসি) নিয়মিত প্রশিক্ষণ চলছে। তথ্যপ্রযুক্তি, নার্সিং, আধুনিক ড্রাইভিং, কেয়ারগিভিং, ইলেকট্রিক্যাল ও মেকানিক্যালসহ মোট ৫৫টি কারিগরি কোর্সে তরুণ-তরুণীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। ইংরেজি ছাড়াও জাপানি, কোরিয়ান, জার্মান ও আরবি ভাষার ওপর বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে যাতে কর্মীরা গন্তব্য দেশে ভাষাগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি না হন। এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে সারাদেশে বর্তমানে ১০৪টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিটিসি) নিয়মিত প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

রেমিট্যান্সের ইতিবাচক ধারা বজায় রাখতে সরকার অদক্ষের পরিবর্তে চাহিদা অনুযায়ী কারিগরি দক্ষতাসম্পন্ন জনশক্তি পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত ১০ দশমিক ৭২ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ১১ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি।

এছাড়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে রেকর্ড ৩৫ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছিল।

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নিবিড় কূটনৈতিক তৎপরতায় বাজারটি পুনরায় খোলার রূপরেখা তৈরি হয়েছে। এতে ৩৩৮টি তালিকাভুক্ত রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী নিয়োগ হবে। এছাড়া বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ অনুরোধে ১০ হাজার কর্মী বিনা খরচে বা জিরো-কস্ট মডেলে নিয়োগের বিষয়ে মালয়েশিয়া কর্তৃপক্ষ নীতিগত সম্মতি দিয়েছে, যা বোয়েসেলের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডের (বোয়েসেল) তত্ত্বাবধানে এ বিশেষ পাইলট কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে। বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে স্বাক্ষরিত নির্দিষ্ট দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী (এসএসডব্লিউ) নিয়োগসংক্রান্ত চুক্তিও কার্যকর রয়েছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) উদ্যোগে ‘সাপোর্টিং আ ট্যালেন্ট পার্টনারশিপ উইথ বাংলাদেশ’ শীর্ষক কাঠামোর আওতায় দক্ষ কর্মী পাঠানোর কাজ চলছে। বোয়েসেল ও বিএমইটির অনলাইন ডেটাবেজ ব্যবহারের মাধ্যমে ইউরোপের নিয়োগদাতাদের সঙ্গে দক্ষ পেশাজীবীদের সরাসরি সংযোগ স্থাপন করা হচ্ছে। এছাড়া ইতালি সরকারের অর্থায়নে বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ ও ভাষা শিক্ষা কর্মসূচি চালু হয়েছে।

যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্যসেবা খাতে নার্স ও কেয়ারগিভারদের নিয়োগ এবং জার্মানির ‘অপরচুনিটি কার্ড’ বা ‘চান্সেনকার্টে’ সুবিধার আওতায় বাংলাদেশিরা কর্মসংস্থানের সুযোগ পাচ্ছেন। এছাড়া রোমানিয়া, গ্রিস, সার্বিয়া, পর্তুগাল, ক্রোয়েশিয়া ও হাঙ্গেরিতে কৃষি ও আতিথেয়তা খাতেও বাড়ছে কর্মসংস্থান। পাশাপাশি রাশিয়া ও ইউরেশিয়ার পোশাক ও উৎপাদনশিল্পে অধিক মূল্য সংযোজনমূলক কারিগরি পদের কর্মসংস্থানের সুযোগও প্রতিবছর বাড়ছে।

ওশেনিয়া অঞ্চলে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে কৃষি ও নির্মাণ খাতে কোটার আওতায় কর্মী পাঠানোর সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। রাশিয়া ও ইউরেশিয়ার দেশগুলোতে এবং মালদ্বীপ ও সেশেলসের পর্যটন ও নির্মাণ শিল্পেও চাহিদা রয়েছে বাংলাদেশি কর্মীদের।

দালালচক্র রুখতে ডিজিটাল ‘মাইগ্র্যান্ট কার্ড’ ব্যবস্থার মাধ্যমে সরকারি চ্যানেলে নিয়োগ নিশ্চিত করা হচ্ছে। এ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রবাসীরা বিমা সুরক্ষা, বিশেষ ব্যাংকিং সুবিধা এবং জরুরি আইনি সহায়তা পাওয়ার সুযোগ পাবেন। সরকার আশা করছে, দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির এই সময়োপযোগী পদক্ষেপ দেশের অর্থনীতিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।

শেয়ার করুন