ভারতের জনবহুল রাজ্য উত্তর প্রদেশে গরু পাচারের অভিযোগে শত শত মুসলিম নাগরিককে বিচারবহির্ভূতভাবে পায়ে গুলি করে পঙ্গু করে দেওয়া হচ্ছে বলে এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। স্থানীয়ভাবে ‘অপারেশন ল্যাংড়া’ নামে পরিচিত এই পদ্ধতি ব্যবহার করে মূলত হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠদের সন্তুষ্ট করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করছেন মানবাধিকার কর্মীরা।
‘সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব অর্গানাইজড হেট’-এর গবেষণা অনুযায়ী, ২০২০ সাল থেকে উত্তর প্রদেশে গরু পাচারের অভিযোগে প্রায় ৬৫০টি ঘটনায় পুলিশ গুলি চালিয়ে সন্দেহভাজনদের আহত করেছে। নিরপেক্ষ পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এসব ঘটনায় ভুক্তভোগীদের প্রায় ৯৩ শতাংশই মুসলিম। প্রতিটি ক্ষেত্রেই গুলি করার জায়গা ছিল একই—হাঁটুর ঠিক নিচে। মানবাধিকার কর্মীদের মতে, পুলিশ যেসব ঘটনার তথ্য প্রকাশ্যে এনেছে এটি তারই চিত্র, বাস্তবে এই সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে।
এই কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে উদ্বেগ প্রকাশ করে এলাহাবাদ হাইকোর্ট চলতি বছরের শুরুতে একে ‘সম্পূর্ণ বেআইনি’ হিসেবে অভিহিত করেছে। আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সন্দেহভাজনদের পায়ে গুলি করার এই প্রবণতা নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে, যা সরাসরি সংবিধানের পরিপন্থি। মানবাধিকার কর্মী সন্দীপ পান্ডের দাবি, নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার এবং মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির সুযোগ নিয়ে ধর্মীয় ভাবাবেগ উসকে দিয়ে মুসলিমদের লক্ষ্যবস্তু বানানো হচ্ছে।
পুলিশের পক্ষ থেকে অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তা অমিতাভ জাস দাবি করেন, পুলিশ কেবল আত্মরক্ষার্থেই গুলি চালায় এবং হাঁটুতে গুলি করার কোনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা নেই। তবে চিকিৎসকদের ভিন্নমত রয়েছে। আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেনসিক মেডিসিনের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কলিম খান বলেন, দৌড়ন্ত বা ধস্তরত অবস্থায় থাকা কোনো ব্যক্তির পায়ে হাড় অক্ষত রেখে সুনির্দিষ্টভাবে এভাবে গুলি লাগা অসম্ভব। তার মতে, এটি কোনোভাবেই আত্মরক্ষামূলক নয়, বরং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে চালানো গুলি। তবে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকেরা বলছেন অন্য কথা।
পরিসংখ্যান বলছে, উত্তর প্রদেশ পুলিশ বাহিনীতে মুসলিম সদস্যের হার মাত্র ৪ দশমিক ৮ শতাংশ। এই বৈষম্যের পাশাপাশি ভুক্তভোগী পরিবারের ওপর নেমে এসেছে চরম দুর্দশা। মহিষের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত এক পরিবারের সদস্যরা জানান, গরু পাচারের মিথ্যা অভিযোগে তাদের ছেলেকে ধরে নিয়ে দুই হাঁটুতেই গুলি করা হয়েছে। পঙ্গু হয়ে যাওয়ায় সে এখন উপার্জনক্ষম নয়, ফলে পুরো পরিবার ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। তথ্য অনুযায়ী, উত্তর প্রদেশের পুলিশ বাহিনীতে মাত্র ৪ দশমিক ৮ শতাংশ মুসলিম সদস্য রয়েছেন, যা রাজ্যের জনসংখ্যার তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য। ভুক্তভোগী পরিবারগুলো চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। মানুষের সাহায্য ও ঋণ নিয়ে কোনোমতে বেঁচে আছে তাদের পরিবার।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত এই ‘হাফ এনকাউন্টার’ বা পঙ্গু করার নীতি অবিলম্বে বন্ধ না করলে ভারতের আইনি শাসন ও গণতান্ত্রিক কাঠামো মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।





