ভারতের রাজপথে এখন এক পরিচিত মুখ নেহা বোরা। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের বিরুদ্ধে বিগত কয়েক মাসে ক্ষুব্ধ ‘জেন–জি’ প্রজন্ম যে তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলেছে, সেই প্রতিবাদী তরুণদের প্রধান প্রতীক হয়ে উঠেছেন ২৯ বছর বয়সী এই বামপন্থী ছাত্রনেত্রী। টানা ১২ বছর ক্ষমতায় থাকার পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সম্প্রতি সবচেয়ে কঠিন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের একের পর এক ঘটনা এবং ভোটার তালিকার বিতর্কিত সংশোধনের কারণে ১৩ কোটি মানুষের নাম বাদ পড়ার অভিযোগ নিয়ে মোদি সরকারের ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করছেন তরুণেরা। কয়েক মাস আগেও ছাত্ররাজনীতির বাইরে নেহা বোরার নাম খুব বেশি মানুষ জানতেন না। রাজপথের এই কৌশলী কর্মী আন্দোলনের মাধ্যমে মোদি সরকারের নীতি ও বিভিন্ন পদে নিয়োগ নিয়ে ক্ষুব্ধ তরুণদের একাংশের কাছে এক আইকনে পরিণত হয়েছেন। তবে রাজনৈতিক নেতাকে দেবতার আসন থেকে নামিয়ে আনার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিলেও নিজের সঙ্গে এমন তুলনা চান না নেহা বোরা। তিনি জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে (জেএনইউ) নাট্যকলায় পোস্টডক্টরাল পর্যায়েও পড়াশোনা করছেন। তখন মোদি সরকার পুরো নয়াদিল্লি কার্যত অবরুদ্ধ করে ফেলে। সেদিন বিকেলে নেহা ইনস্টাগ্রাম লাইভে আসেন। পশ্চিমবঙ্গের নকশালবাড়ি গ্রামের কৃষক বিদ্রোহ ছিল সেই আন্দোলনের অনুপ্রেরণা। এরপর কয়েক মাস আগে যন্তর মন্তরে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের প্রতি সংহতি জানিয়ে নেহা টানা ২৩ দিন অনশন করেন।
১২ অক্টোবর ভারতের প্রধান বিরোধী দলের নেতা রাহুল গান্ধী হাজার হাজার সমর্থককে নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের উদ্দেশে পদযাত্রা করেন। প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে অপসারণের দাবিতে আদালতে একটি আবেদন জমা দিতে যাচ্ছিলেন তিনি। এ সময় পদযাত্রায় সামনে থাকা দুই নারীর কাঁধে রাহুল গান্ধী হাত রেখেছিলেন। ওই দুই নারীর একজন রাহুলের চেয়ে দুই বছরের ছোট বোন প্রিয়াঙ্কা গান্ধী। রাহুল গান্ধী তাঁর বোনকে নিজের ‘সবচেয়ে ভালো বন্ধু’ ও সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহযোগী বলে অভিহিত করেছেন। অপরজন ছিলেন ২৯ বছর বয়সী ছাত্রনেত্রী নেহা বোরা। কিন্তু নেহা আন্দোলনকারীদের ধরতে আসা নিরাপত্তা বাহিনীকে ফাঁকি দেওয়ার এক কৌশল রপ্ত করেছেন। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে ১০ অক্টোবর হাজার হাজার তরুণ আন্দোলনের প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। পুলিশ ট্রেন ও বাসে আসা আন্দোলনকারীদের দ্রুত আটক করে। এমনকি উড়োজাহাজে রাজধানীতে পৌঁছামাত্র ককরোচ আন্দোলনের শীর্ষ নেতাদের উড়োজাহাজ থেকেই আটক করে পুলিশ।
নেহা বোরা দেখতে ছিপছিপে গড়নের, চুল কালো এবং কণ্ঠস্বর বেশ গম্ভীর ও বলিষ্ঠ। ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতারা প্ল্যাকার্ড হাতে অবস্থান ধর্মঘট করেন এবং পুলিশ সহজেই তাঁদের ধরে ফেলে। এসব কিছুর ধারাবাহিকতায় সফটওয়্যার ডেভেলপাররা নেহাকে নিয়ে সুপার মারিও ধাঁচের ভিডিও গেম তৈরি করেছেন। সেখানে গেমের প্রধান চরিত্র পুলিশের ব্যারিকেড টপকে ‘গণতন্ত্র পয়েন্ট’ সংগ্রহ করে এবং পুলিশকে এড়িয়ে ছুটে চলে। দিল্লির ২৪ বছর বয়সী শিক্ষার্থী নিশিতা নাথ চলতি মাসের শুরুর দিকে সেন্ট্রাল দিল্লিতে বসে বলেন, ‘আমরা কি নেহাকে “গণতন্ত্রের দেবী” বলতে পারি?’ তিনি হংকংয়ের তরুণ প্রজন্মের আন্দোলনের সঙ্গে নেহার প্রভাবের মিল খুঁজে পান। নিশিতা বলেন, ‘নেহা যেভাবে কথা বলেন, তাঁর কণ্ঠের ওঠানামা, বাতাসে উড়তে থাকা চুল, কী আর বলব, আমার ইনস্টাগ্রামজুড়ে শুধুই নেহা।’ তিনি হংকংয়ের আন্দোলনকারী নেত্রী অ্যাগনেস চাউয়ের সঙ্গে নেহার তুলনা টানেন। বিশ্বজুড়ে জেন–জি প্রজন্মের প্রতিবাদের প্রতীক অ্যানিমে ‘ওয়ান পিস’–এর টি–শার্ট পরে তিনি দক্ষিণ দিল্লির অভিজাত এলাকায় উপস্থিত হন। প্রায় আধা ঘণ্টা পর পুলিশ ধাওয়া করে নেহাকে ভ্যানে তুলে নিয়ে যায় এবং কয়েক ঘণ্টা পর তাঁকে ছেড়ে দেয়। পরে তাঁর মা ভেতরে এসে স্নেহের পরশে নেহার পায়ে হাত বুলিয়ে দেন।
নেহা বর্তমানে বামপন্থী ছাত্রসংগঠন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (আইসা) সর্বভারতীয় সভাপতি।
শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে চলতি বছরের শুরুর দিকে তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা ককরোচ আন্দোলনের কর্মীদের সঙ্গে যন্তর মন্তরে কয়েক সপ্তাহ অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন।
বন্ধুদের মতে, এই তরুণ বামপন্থী নেত্রী নিজেও ভালো গান করেন এবং ডাফলি বাজাতে পারেন।
আগের প্রজন্মের অনেক বামপন্থীর বিরুদ্ধে মার্ক্সবাদকে অতিরিক্ত মতবাদনির্ভর ও তাত্ত্বিকভাবে প্রয়োগ করার অভিযোগ থাকলেও নেহা নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধি। অনেক ছাত্রনেতাকে নিজ নিজ বাড়িতে নজরবন্দী করা হয়।
নয়াদিল্লিভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক আসিম আলী বলেন, ‘ছাত্রনেতাদের ক্যাম্পাস থেকে সরাসরি সংসদীয় নির্বাচনী এলাকার রাজনীতিতে নিয়ে যাওয়ার মতো শক্ত ভিত আইসার নেই। আসিম আলী আরও বলেন, নেহার মতো তরুণ নেতাদের নির্বাচনী রাজনীতিতে আসার একটি উপায় হলো কংগ্রেসের মতো মূলধারার কোনো বড় জাতীয় দলে যোগ দেওয়া।
নেহার রাজপথের রাজনীতি বুঝতে হলে আগে ইতিহাসের দিকে তাকাতে হবে। ১৯৯০ সালের আগস্টে গঠিত হয় আইসা। এটি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী–লেনিনবাদী) লিবারেশনের ছাত্র সংগঠন। রাষ্ট্রীয় দমন–পীড়নের মুখে দলটি অন্তত তিন দশক গোপনে কাজ করেছে। ১৯৯০–এর দশকে তারা সশস্ত্র পথ ত্যাগ করে সংসদীয় গণতন্ত্রের ধারায় যুক্ত হয়। নেহার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও আইসার ২৫ বছর বয়সী ছাত্রনেতা দানিশ আলী বলেন, ‘নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আগে আমাদের দল দীর্ঘদিন গোপনে পরিচালিত হতো। আমরা সেই একই ধারা অনুসরণ করছি।’ দলটির উত্থান ঘটে ১৯৬৭ সালে পূর্ব ভারতে শুরু হওয়া মাওবাদী নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্ট বিদ্রোহের ধারায়। ১৯৯০–এর দশকে তারা সশস্ত্র পথ ত্যাগ করে সংসদীয় গণতন্ত্রের ধারায় যুক্ত হয়, যদিও তাদের কিছু ভাঙনধারা এখনো সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পক্ষপাতী।
দানিশ আরও জানান, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বিপ্লবী ভগত সিং যেসব প্রতিরোধ কৌশল ব্যবহার করেছিলেন, দল এখনো সেসব কৌশলের ওপর আস্থা রাখে। ১৯৩১ সালে শহীদ হওয়া ভগত সিং স্বঘোষিত মার্ক্সবাদী হলেও ভারতের বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষের কাছে তিনি পরম শ্রদ্ধার পাত্র। অন্যদিকে মোদির হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপি বাম রাজনীতিকে বারবার আক্রমণ করে আসছে। আন্দোলনের মুখে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করার পর গত আগস্টে স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে প্রধানমন্ত্রী মোদি ‘আরবান নকশাল’ বা ‘বুদ্ধিজীবী নকশালদের’ হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। নেহার মতে, বিজেপি বামপন্থীদের ভয় পায় বলেই এমন বক্তব্য দেয়। আল–জাজিরাকে তিনি বলেন, ‘ভারতের স্বাধীনতা এনে দেওয়া বিপ্লবী ধারার প্রকৃত উত্তরসূরিদের গ্রহণযোগ্যতা ক্রমশ বাড়ছে।’ ১৯৩১ সালে মাত্র ২৩ বছর বয়সে ব্রিটিশ শাসকেরা ভগত সিংকে ফাঁসি দিয়েছিল। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ভারতের সংসদ ও বিভিন্ন রাজ্যের বিধানসভায়ও বাম দলগুলো বড় ধরনের রাজনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে।
ভারতের উত্তরাখন্ডের খাতিমা নামের এক ছোট শহরে নেহার জন্ম। তাঁর বাবা ভারতীয় সেনাবাহিনীতে চাকরি করতেন। বাবার চাকরির সুবাদে তাঁর পরিবার জম্মু, বেঙ্গালুরু, অমৃতসরসহ বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেছে। কৈশোরে পরিবারের সঙ্গে নেহার রাজনৈতিক মতপার্থক্য বাড়তে থাকে, কারণ তাঁর বাবা–মাসহ অন্য সদস্যরা বিজেপির সক্রিয় সমর্থক। একপর্যায়ে বাবা–মায়ের সঙ্গে রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে তিনি বাড়ি ছাড়েন। অনশন চলাকালের এক স্মৃতির কথা উল্লেখ করে নেহা বলেন, হাজারো মানুষের ভিড়ের মধ্য থেকে একজন এসে তাঁকে বলেছিলেন, ‘বাইরে একজন নারী নিজেকে আপনার মা বলে পরিচয় দিচ্ছেন এবং আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাইছেন।’
আইসার জ্যেষ্ঠ নেতা ও নেহার পরামর্শক এন সাই বালাজি বলেন, এই অনশনই নেহাকে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিত করে তোলে। এর ফলে সাধারণ মানুষ তাঁর বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হতে শুরু করে। বালাজি আল–জাজিরাকে বলেন, ‘সরকারের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গে হতাশ ভারতের উন্নত জীবনের প্রত্যাশী তরুণ প্রজন্ম এখন নেহাকে নিজেদের কণ্ঠস্বর হিসেবে দেখছে। তিনি ভারতের রাজনীতিতে নতুন একটি জায়গা তৈরি করে নিচ্ছেন।’ কলেজ–বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বর পেরিয়ে তিনি এখন ভারতীয় রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।





