১৩ আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মিরপুরে রাড্ডা ক্লিনিকে তাণ্ডব: মূল নির্দেশদাতারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে

প্রকাশ:

রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ কার্যালয় ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভয়াবহ লুটপাট এবং ভাঙচুরের ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৯ জনকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী লুট হওয়া মালামালের মধ্যে দুই ট্রাক পণ্য উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে। তবে ঘটনার দুই দিন পেরিয়ে গেলেও এই তাণ্ডবের মূল ইন্ধনদাতা বা নির্দেশদাতাদের পরিচয় এখনো পরিষ্কার নয়, তাদের কাউকে গ্রেপ্তারও করা সম্ভব হয়নি। পুলিশি তদন্তে এখনো তাদের নাম উঠে আসেনি বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

স্থানীয়রা অভিযোগ করছেন, এই হামলা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় জমি দখলের উদ্দেশ্যে এটি পরিকল্পিতভাবে চালানো হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, ঘটনার সময় পুলিশ উপস্থিত থাকলেও তাদের ভূমিকা ছিল নিষ্ক্রিয়। পুলিশের উপস্থিতিতেই দুর্বৃত্তরা নির্বিঘ্নে লুটপাট চালিয়েছে বলে স্থানীয়রা দাবি করেছেন। বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হচ্ছে, এই ঘটনায় স্থানীয় সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি এবং ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির কয়েকজন প্রভাবশালী নেতার সম্পৃক্ততা থাকতে পারে। যদিও এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও সাড়া পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন সূত্র বলছে, স্থানীয় প্রভাবশালী নেতৃবৃন্দের ছত্রছায়ায় ঘটনাটি ঘটেছে। বলছেন, এই হামলা স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব ছাড়া ঘটানো সম্ভব নয়। প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট, দায়ের করা মামলার এজাহার ও স্থানীয়সূত্রে জানা যায়, ঘটনাটি জমি দখল সংক্রান্ত বিষয় নিয়েই ঘটানো হয়েছে। তবে প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয়দের দাবি, জায়গা দখল করা নিয়ে ঘটনাটি ঘটানো হলেও আগে কখনই জোরপূর্বক দখল করার চেষ্টা করেনি কেউ। মতলব নামের একজন ব্যবসায়ী বলেন, এই হাসপাতালের জায়গায় কেউ দখল করার অধিকার নেই। এই সমস্ত জায়গা সম্পত্তি সব শাহ-আলী পীরের নামের ছিল। কিন্তু বিভিন্ন সরকারের আমলে বিভিন্ন সরকারের এমপি মন্ত্রীরা টাকা-পয়সার বিনিময়ে অনেক জমি দখল করে নেয়।

তদন্তের বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মো. আকতার হোসেন জানিয়েছেন, তদন্ত এখনও চলমান থাকায় এখনই ঢালাওভাবে কাউকে অভিযুক্ত করা যাচ্ছে না। তবে তদন্ত শেষ পর্যায়ে এলে জড়িতদের সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে। রাড্ডা কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালক ড. নাসরিন আখতার আক্ষেপ করে বলেন, প্রতিষ্ঠানের ওপর এই হামলায় কারা নির্দেশ দিয়েছে, তা আজও রহস্য। আইনি প্রক্রিয়ায় তারা ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় থাকলেও মূল পরিকল্পনাকারীদের গ্রেপ্তার না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে ঘটা এই ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, রাত ১২টা ১৫ মিনিটে হাসপাতালের সামনে একটি ট্রাক দাঁড়ায়। এরপর এস্কাভেটর দিয়ে ভাঙচুর শুরু হওয়ার সাথে সাথে মাস্কবিহীন অসংখ্য দুর্বৃত্ত ভেতরে ঢুকে পড়ে। সেই সময় পুলিশের গাড়ি উপস্থিত থাকলেও তারা কেন কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি, তা নিয়ে জনমনে তীব্র প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। যুবদলের স্থানীয় নেতা সাজ্জাদুল মিরাজও ঘটনার সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অভিযোগ করেছিলেন যে, পুলিশের সামনেই এই ভাঙচুর চালানো হচ্ছে। রাতের আঁধারে একটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে কেন এভাবে হামলা-ভাঙচুর চালানো হলো, এই প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই।

এই ঘটনায় পুলিশের দায়িত্বহীনতার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ায় প্রশাসনিক পদক্ষেপে বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের নির্দেশে শাহআলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহাঙ্গীর আলমকে প্রত্যাহার করে কেন্দ্রীয় সংরক্ষণ দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সচিবালয়ে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জানিয়েছেন, পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার জন্য ওই ওসির বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হচ্ছে।

রোববার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক। তিনি জানান, এই ঘটনার সঙ্গে দলীয় নেতাকর্মী ও এক সংসদ সদস্যের নাম শোনা যাচ্ছে এবং তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই দিন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) মিছিল ও বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছে। দলটির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া অভিযোগ করেন, ক্ষমতাসীন দলের যোগসাজশেই এই হামলা হয়েছে। তিনি অবিলম্বে স্থানীয় নারী এমপি, বিএনপির নেতাকর্মী এবং পুলিশের দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। ক্লিনিকটি পুনরায় আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার জন্য এলাকাবাসী ও বিভিন্ন সংগঠন দাবি জানিয়ে আসছে।

শেয়ার করুন