জরায়ুমুখের ক্যানসার প্রতিরোধে টিকার গুরুত্ব ও সচেতনতা

প্রকাশ:

বাংলাদেশে নারীদের মধ্যে ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার হার ক্রমান্বয়ে উদ্বেগজনক রূপ নিচ্ছে। এর মধ্যে জরায়ুমুখের ক্যানসার তালিকার তৃতীয় স্থানে অবস্থান করছে। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এই ক্যানসারের প্রকোপ প্রায় ৮০ শতাংশ। মূলত হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস বা এইচপিভি নামক যৌনবাহিত ভাইরাসের সংক্রমণই এই মরণব্যাধির প্রধান কারণ। শারীরিক সম্পর্কের মাধ্যমে এই ভাইরাস নারীদেহে প্রবেশ করে থাকে।

এই ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার পেছনে বেশ কিছু নির্দিষ্ট ঝুঁকি বিদ্যমান। এর মধ্যে অল্প বয়সে বিয়ে বা কম বয়সে শারীরিক সম্পর্কে জড়ানো, অপ্রাপ্তবয়সে সন্তান ধারণ, ঘন ঘন অধিক সন্তান জন্ম দেওয়া এবং একাধিক যৌনসঙ্গী থাকা অন্যতম। এছাড়া দারিদ্র্য বা নিম্নবিত্ত জীবনযাপন, সুরক্ষা ছাড়া শারীরিক সম্পর্ক এবং দীর্ঘকাল ধরে গর্ভনিরোধক পিল ব্যবহারেও এই রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।

রোগটি প্রতিরোধে এর লক্ষণগুলো শুরুতেই শনাক্ত করা অত্যন্ত জরুরি। সহবাসের পর যোনিপথে রক্তপাত, অনিয়মিত মাসিক, অতিরিক্ত ঋতুস্রাব কিংবা দুটি মাসিকের মধ্যবর্তী সময়ে রক্তক্ষরণ হলে সতর্ক হতে হবে। পাশাপাশি দুর্গন্ধযুক্ত বা অতিরিক্ত সাদা স্রাব, পানির মতো বা রক্তমিশ্রিত স্রাব নির্গমন এবং মেনোপজ বা ঋতুবন্ধের পর পুনরায় রক্তপাত হওয়া জরায়ুমুখের ক্যানসারের স্পষ্ট উপসর্গ। রোগটি অগ্রসর হলে তলপেট, কোমর ও হাড়ে তীব্র ব্যথা হতে পারে, এমনকি কাশির সঙ্গে রক্ত আসার মতো লক্ষণও দেখা দিতে পারে।

তবে সঠিক সচেতনতা ও সময়োপযোগী পদক্ষেপে এই ক্যানসার সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য। কম বয়সে মেয়েদের বিয়ে ও গর্ভধারণ রোধ করা, যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং একক ও নিরাপদ যৌন সম্পর্ক বজায় রাখা এ রোগের ঝুঁকি অনেকাংশে কমায়। পাশাপাশি ৩০ থেকে ৩৫ বছর বয়সী নারীর প্রতি তিন বছর পর পর নিয়মিত ‘ভায়া’ (VIA) পরীক্ষা করানো উচিত এবং কোনো লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ামাত্র বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া বাধ্যতামূলক।

জরায়ুমুখের ক্যানসার প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর ও নির্ভরযোগ্য উপায় হলো টিকা গ্রহণ করা। এই টিকা প্রায় ৮৫ শতাংশ ক্ষেত্রে ক্যানসার প্রতিরোধে সক্ষম এবং বর্তমানে এটি আমাদের দেশে সহজলভ্য। ৯ থেকে ৪৫ বছর বয়সী যেকোনো নারী এই টিকা গ্রহণ করতে পারেন, তবে বিবাহিত জীবন বা শারীরিক সম্পর্ক শুরু করার আগে অর্থাৎ ৯ থেকে ২৬ বছর বয়সের মধ্যে টিকা নেওয়া সবচেয়ে বেশি কার্যকর।

বয়স ভেদে টিকার মাত্রা বা ডোজের ভিন্নতা রয়েছে। ৯ থেকে ১৪ বছর বয়সী কিশোরীর ক্ষেত্রে মোট দুটি ডোজ নিতে হয়, যেখানে প্রথম ডোজের ছয় মাস পর দ্বিতীয় ডোজটি দেওয়া হয়। অন্যদিকে ১৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সী নারীর নিতে হয় তিনটি ডোজ। এক্ষেত্রে প্রথম টিকা নেওয়ার এক মাস পর দ্বিতীয়টি এবং ছয় মাস পর তৃতীয় বা শেষ ডোজটি নিতে হয়। কোনো কারণে নির্ধারিত ডোজ বাদ পড়লে বা বিলম্ব হলে প্রথম ডোজ দেওয়ার ১২ মাসের মধ্যে পরবর্তী ডোজ সম্পন্ন করা স্বাস্থ্যসম্মত। সার্বিক সচেতনতা ও সঠিক সময়ে টিকা গ্রহণই পারে নারীকে এই মরণব্যাধি থেকে সুরক্ষিত রাখতে।

শেয়ার করুন