রাশিয়ায় চাকরিতে পদোন্নতি পেয়ে জীবনে নতুন আশার আলো দেখেছিলেন ভৈরবের জাকির হোসেন। স্ত্রীকে ফোন করে খুশির খবর জানিয়েছিলেন যে, তাঁর বেতন বাড়বে এবং এর ফলে সংসারের কষ্ট দূর হবে ও ঋণ শোধ করা সহজ হবে। কিন্তু সেই খুশির রেশ কাটতে না কাটতেই এক মাসের মাথায় রাশিয়ার আমুর গ্যাস কেমিক্যাল কমপ্লেক্সে ভয়াবহ বিস্ফোরণে প্রাণ হারালেন তিনি। গত মঙ্গলবার ঘটা এই দুর্ঘটনায় ১৫ জন নিহত হন, যার মধ্যে জাকির একজন। বৃহস্পতিবার তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
জাকিরের বাড়ি ভৈরব উপজেলার কালিকাপ্রসাদ ইউনিয়নের আতকাপাড়া গ্রামে। পরিবারে এখন শোকের ছায়া। তাঁর রেখে যাওয়া এক বছরের সন্তান তায়েবাকে নিয়ে স্ত্রী রিপা বেগম শোকে বিহ্বল। জাকিরের বাবা রতন মিয়া আট মাস আগে মারা গেছেন। বাড়িতে এখন মা রোকেয়া বেগম, স্ত্রী, সন্তান ও তিন ভাই রয়েছেন। ছেলের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকে মা রোকেয়া বেগম খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, অভাব দূর করতে ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন, কিন্তু এখন জমানো জমিজমা সব শেষ হয়ে তার সন্তান পুড়ে অঙ্গার হয়েছে।
পরিবারের সদস্যরা জানান, জাকিররা অর্থনৈতিকভাবে অস্বচ্ছল। দুই ভাই দেলোয়ার হোসেন ও শরিফ হোসেন অন্যের জমিতে কৃষিকাজ করেন এবং ছোট ভাই নূর আলম রিকশা চালান। সংসারের অভাব মেটাতে জাকির নিজেও ভৈরবের সড়কে অটোরিকশা চালাতেন। শেষ পর্যন্ত পরিবারের সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিয়ে ২০২৫ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি সাত লাখ টাকা খরচ করে জাকিরকে রাশিয়ায় পাঠানো হয়। এই অর্থের চার লাখ টাকা জমি বিক্রি করে এবং দুই লাখ টাকা এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে জোগাড় করা হয়েছিল।
রাশিয়ায় আমুর গ্যাস কেমিক্যাল কমপ্লেক্সে কাজ পাওয়া জাকির মাসে প্রায় ৬০ হাজার টাকা বেতন পেতেন। নিজের খরচ মিটিয়ে যা পাঠাতেন, তা দিয়ে ঋণ শোধ করতে হতো। এখনো প্রায় দেড় লাখ টাকা ঋণ রয়েছে পরিবারটির। জাকিরের চাচাতো ভাই আলী হোসেন রাশিয়ায় তাঁর সঙ্গেই থাকতেন। শুক্রবার আলী হোসেনই বাড়িতে জাকিরের মৃত্যুর খবরটি জানান। স্বজনরা এখন জাকিরের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন।
ভৈরব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কে এম মামুনুর রশীদ জানিয়েছেন, জাকিরের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের চেষ্টা করা হবে। পরিবারটি অত্যন্ত অস্বচ্ছল হওয়ায় তাদের আর্থিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়েও চিন্তা করা হচ্ছে বলে তিনি জানিয়েছেন।
দুই ভাই দেলোয়ার হোসেন (২৪) ও শরিফ হোসেন (২২) অন্যের জমিতে কৃষিকাজ করেন।





