চার দশক আগের সেই চেনা মঞ্চ। নিউ ইয়র্কের জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সাধারণ পরিষদ হল। তখন ড. খলিলুর রহমান ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা, সঙ্গে ছিলেন তৎকালীন ৪১তম অধিবেশনের সভাপতি হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী। ইতিহাসের এক অদ্ভুত পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে দীর্ঘ ৪০ বছর পর সেই একই মঞ্চে তিনি এখন কেবল বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীই নন, বরং জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে বিশ্বনেতাদের সামনে দাঁড়িয়েছেন। গতকাল স্থানীয় সময় সকালে এই অধিবেশনের বহুল প্রতীক্ষিত সাধারণ বিতর্ক শুরু হয়েছে, যা ২২ থেকে ২৬শে সেপ্টেম্বর এবং বিরতির পর ২৮শে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে।
উদ্বোধনী বক্তব্যে ড. খলিল নিজের চার দশকের স্মৃতিচারণ করে বলেন, ১৯৪১ সালে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী যে সংকটের কথা বলেছিলেন, বর্তমান বিশ্বে সেই সংকট আরও ঘনীভূত। এবারের বিতর্কের মূল প্রতিপাদ্য হলো ‘আস্থা পুনরুদ্ধার, পরিবর্তন মোকাবিলা: সবার জন্য ফলপ্রসূ একটি জাতিসংঘ’। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তিনি সংস্থাটির হারানো আস্থা পুনর্গঠনকে মূল লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, আস্থা কেউ এমনিতেই দেয় না, এটি অর্জন করতে হয়। এর জন্য প্রয়োজন নিজের ভুলগুলো স্বীকার করা, মৌলিক সংস্কার আনা এবং সব পক্ষকে সম্পৃক্ত করা।
বর্তমান বিশ্বের অস্থিরতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, গাজা, সুদান, ইউক্রেন, মিয়ানমারসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে চলমান সংঘাত মোকাবিলায় জাতিসংঘ অনেক ক্ষেত্রেই ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, বিশ্ববাসী এখন আর জানতে চায় না জাতিসংঘ টিকে আছে কি না, বরং জানতে চায় সংস্থাটি ঠিক কী করছে। যদিও যুদ্ধের মাঝেও জাতিসংঘ তার মানবিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে, তবে নিরাপত্তা পরিষদের অকার্যকারিতা ও সিদ্ধান্তহীনতা পুরো সংস্থার ভাবমূর্তিকে সংকটে ফেলেছে। তাই আফ্রিকার প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোসহ নিরাপত্তা পরিষদের ঢালাও সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন তিনি।
উন্নয়নশীল দেশগুলোর সংকট তুলে ধরতে গিয়ে ড. খলিল জানান, বিশ্বজুড়ে সামরিক ব্যয় বাড়লেও উন্নয়ন সহায়তা ক্রমশ কমছে, যা মানবিক বিপর্যয় ত্বরান্বিত করছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট টেনে তিনি বলেন, অতীতে কর্তৃত্ববাদী শাসনামলে বাংলাদেশ থেকে ব্যাপক মূলধন পাচার হয়েছে যা দেশের উন্নয়নকে চরমভাবে বাধাগ্রস্ত করেছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোকে নিজস্ব সম্পদের ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর পাশাপাশি অর্থ পাচার ও দুর্নীতি রোধে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে।
মানবাধিকার ও বিশ্বশান্তি প্রসঙ্গে বাংলাদেশের অবদান স্মরণ করিয়ে তিনি বলেন, আমাদের শান্তিরক্ষীরা কেবল শান্তি রক্ষাই করছেন না, বরং রাস্তা তৈরি, সমাজ পুনর্গঠন ও শিশুদের খাদ্য সহায়তার মতো মানবিক কাজ করে যাচ্ছেন। এছাড়া ঘৃণাত্মক বক্তব্য বা হেট স্পিচ মোকাবিলায় বিশ্বব্যাপী সংলাপ ও সহনশীলতার সংস্কৃতি গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
বক্তব্যের নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। ড. খলিলুর রহমান বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানব সভ্যতার অগ্রগতির গতিপথ বদলে দিতে সক্ষম। তবে এর সঙ্গে বেকারত্ব ও ডিজিটাল বৈষম্যের মতো ঝুঁকিও রয়েছে। তাই উদ্ভাবন বন্ধ না করে বরং বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ভিত্তিতে একটি আন্তর্জাতিক সুরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। পরিশেষে, কঠিন সত্যকে স্বীকার করে সাহসী সংস্কারের মাধ্যমে জাতিসংঘকে নতুন পথে পরিচালিত করার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন তিনি। চাকরির আরও তথ্য: তবে এবার তিনি শুধু বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী নন। চাকরির আরও তথ্য: বিশ্বের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এবং উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা এতে বক্তব্য দেবেন। চাকরির আরও তথ্য: নিজের সেই স্মৃতিকথন দিয়েই ৮১তম অধিবেশনে সভাপতিত্ব শুরু করলেন ড। চাকরির আরও তথ্য: আর সেই স্মৃতিকাতরতার মধ্যে উঠে এলো আজকের জাতিসংঘ। চাকরির আরও তথ্য: পরে ফ্রান্সসহ অন্য দেশগুলোর প্রতিনিধিরা বক্তব্য দেন। চাকরির আরও তথ্য: মঙ্গলবারের অধিবেশনে বক্তব্য রাখেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পও। চাকরির আরও তথ্য: ১৯৪৫ সালে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার ইতিহাস টেনে ড। চাকরির আরও তথ্য: খলিল বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ ও হলোকাস্টের পর বিশ্বকে একটি অভিন্ন কাঠামোর মধ্যে আনার প্রয়োজন থেকেই এই প্রতিষ্ঠানের জন্ম।


