বর্তমান সময়ে প্রেমের ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা বাড়ায় তরুণ প্রজন্ম বা জেন-জিরা নতুন ধরনের উপায়ের সন্ধানে নেমেছে। পছন্দের মানুষকে কাছে পেতে বা সম্পর্কের জটিলতা কাটাতে তারা এখন ডিজিটাল প্রযুক্তি থেকে সরে এসে বিভিন্ন ধরনের আধ্যাত্মিক ও জাদুবিদ্যার ওপর ভরসা রাখছে। ম্যানিফেস্টেশন, ট্যারো কার্ড রিডিং কিংবা লাভ স্পেল ব্যবহারের মতো প্রবণতা তাদের জীবনধারার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠছে। প্রেমের ক্ষেত্রে কেউ কেমন জীবনসঙ্গী চান, সম্পর্কের মধ্যে কী ধরনের অনুভূতি ও বোঝাপড়া আশা করেন, সেসব লিখে রাখেন। আধুনিক প্রেমের ক্ষেত্রে যোগাযোগের সুযোগ অনেক বেড়েছে। প্রেমের ক্ষেত্রেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ডেটিং নিউজ (DatingNews) সম্প্রতি ১ হাজার ১৩ জন প্রাপ্তবয়স্কের ওপর একটি জরিপ পরিচালনা করেছে। এতে উঠে এসেছে যে, জেন-জি প্রজন্মের ৬৪ শতাংশই তাদের জীবনে অন্তত একবার প্রেমের সম্পর্ক সুন্দর করতে কিংবা কাঙ্ক্ষিত সঙ্গীকে পেতে বিশেষ কোনো আধ্যাত্মিক বা সাইকিক পদ্ধতি অবলম্বন করেছে। এই চর্চার মধ্যে জনপ্রিয়তার শীর্ষে রয়েছে ম্যানিফেস্টেশন বা স্ক্রিপ্টিং, যা প্রায় ২৯ শতাংশ তরুণ অনুসরণ করে থাকেন। তবে অনলাইন সংস্কৃতিতে ছড়িয়ে পড়া এই প্রবণতা তরুণ প্রজন্মের প্রেম ও সম্পর্ক নিয়ে ভাবনার একটি নতুন দিক তুলে ধরছে। এই প্রক্রিয়ার একটি পরিচিত ধরন স্ক্রিপ্টিং। অন্যদিকে ২৯ শতাংশের অভিজ্ঞতা ছিল আংশিক সফলতার। তাঁর গবেষণা বলছে, শুধু কাঙ্ক্ষিত ভবিষ্যতের স্বপ্নে ডুবে থাকলে লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রচেষ্টা কমে যেতে পারে।
জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ২৫ শতাংশ তরুণ সম্পর্কের ক্ষেত্রে সাইকিকের পরামর্শ নেন।
এছাড়া ১৭ শতাংশ ট্যারো কার্ড রিডারের কাছে যান এবং ১৬ শতাংশ অ্যাস্ট্রোলজি বা রাশিচক্রের সামঞ্জস্যের ওপর নির্ভর করেন। অন্যদিকে ১৪ শতাংশ দৈনিক রাশিফল, ১০ শতাংশ সাইকিক বা ট্যারো রিডারের পরামর্শ এবং ৮ শতাংশ লাভ স্পেলের ওপর আস্থা রাখার কথা জানিয়েছেন।
১৯ শতাংশ তরুণ আবার বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে ভালোবাসার বিশেষ রিচুয়াল বা লাভ স্পেলের জন্য অর্থ ব্যয় করেছেন।
তবে মনে রাখা জরুরি, এটি কেবল যুক্তরাষ্ট্রের এক হাজার ১৩ জনের ওপর করা গবেষণার ফলাফল, যা বিশ্বজনীন কোনো চিত্র নয়। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলের গবেষকদের ২০১৬ সালের একটি গবেষণাও প্রাসঙ্গিক।
ম্যানিফেস্টেশন বা স্ক্রিপ্টিং মূলত নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ইতিবাচক কল্পনার একটি প্রক্রিয়া। তরুণরা সেখানে তাদের কাঙ্ক্ষিত সঙ্গীর গুণাবলী বা সম্পর্কের চিত্র মনের মাধুরী মিশিয়ে লিখে রাখেন। তাঁদের বিশ্বাস, এভাবে লিখে রাখলে কাঙ্ক্ষিত সম্পর্কটি বাস্তবে রূপ পাওয়া সহজ হয়। কিন্তু মনের কথা বোঝা কিংবা সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চিত হওয়া সহজ হয়নি।
আধুনিক ডেটিং অ্যাপের যুগে সম্পর্কের স্থায়িত্ব নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ। মেসেজের উত্তর না পাওয়া, হঠাৎ সম্পর্কে বিচ্ছেদ বা দীর্ঘদিনের সম্পর্কের নাম দেওয়া না যাওয়ার মতো বিষয়গুলো তরুণদের মানসিকভাবে অস্থির করে তোলে। সেই অনিশ্চয়তা কাটাতে এবং সম্পর্কের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে একটু আশ্বস্ত হতে তারা এখন ট্যারো বা অ্যাস্ট্রোলজির মতো বিকল্পের দ্বারস্থ হচ্ছেন।
মনোবিজ্ঞানের গবেষণাতেও এই ধরণের আচরণের ব্যাখ্যা রয়েছে। ২০১৪ সালে হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের গবেষক মাইকেল নর্টন ও ফ্রান্সেসকা জিনো তাঁদের গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, কোনো প্রিয়জন হারানোর বেদনা বা সম্পর্কের দুঃসময় কাটাতে মানুষ বিভিন্ন প্রতীকী আচার বা রিচুয়াল পালন করে। এটি মূলত ব্যক্তির পরিস্থিতির ওপর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার একটি মানসিক কৌশল। অনেক সময় কোনো ঘটনার সঙ্গে একটি রিচুয়ালের সময় মিলে গেলেই মানুষ সেটিকে কার্যকারণ হিসেবে ধরে নিতে পারেন।
জরিপে অংশগ্রহণকারী ৪৬ শতাংশ জানিয়েছেন, এসব পদ্ধতি তাদের জীবনে কিছুটা কার্যকর ছিল, তবে ১৭ শতাংশ স্পষ্টভাবে দাবি করেছেন এগুলো পুরোপুরি কাজে দিয়েছে। আবার অনেকের ক্ষেত্রে ফলাফল ছিল আংশিক সফল। তবে এগুলোর সঙ্গে বৈজ্ঞানিক কোনো সম্পর্কের সরাসরি প্রমাণ নেই। জরিপে অংশ নেওয়া যেসব জেন–জি পদ্ধতিগুলো চেষ্টা করেছেন, তাঁদের ৪৬ শতাংশ জানিয়েছেন, তাঁদের অভিজ্ঞতায় এগুলো অনেক ক্ষেত্রেই কাজ করেছে।
গবেষণার তথ্যের উৎস ও প্রাসঙ্গিকতা সম্পর্কে বিস্তারিত নিচে দেওয়া হলো
গবেষণা ও জরিপের তথ্যসূত্র
- DatingNews (৬ অক্টোবর ২০২৬): ১,০১৩ জন মার্কিন প্রাপ্তবয়স্কের ওপর পরিচালিত জরিপ, যেখানে জেন-জি প্রজন্মের আধ্যাত্মিক চর্চার প্রবণতা উঠে এসেছে।
- Harvard Business School (২০১৪): মাইকেল নর্টন ও ফ্রান্সেসকা জিনোর গবেষণায় উঠে এসেছে, রিচুয়াল বা আচার মানুষের শোক ও মানসিক কষ্ট কমাতে সহায়তা করে।
- Harvard ও UC Berkeley (২০১৬): গবেষক দলের মতে, নির্দিষ্ট কিছু রিচুয়াল উদ্বেগ কমাতে এবং প্রথম ডেটের মতো পরিস্থিতিতে মানসিক চাপ সামলাতে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে।
- Gabriele Oettingen (২০১৬): মনোবিজ্ঞানী গ্যাব্রিয়েলে ওটিঙ্গেনের গবেষণায় ইতিবাচক কল্পনার পাশাপাশি বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়ার গুরুত্বের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
- Pew Research Center (২০২৫): ৯,৫৯৩ জনের ওপর করা জরিপে দেখা গেছে, ট্যারো বা ভাগ্য গণনার চর্চায় মানুষ মূলত বিনোদনের উদ্দেশ্যেই যুক্ত হন।
পরিশেষে, ডেটিং নিউজের জরিপ অনুযায়ী তরুণদের সিংহভাগ অর্থাৎ ৩৮ শতাংশ এখনো পেশাদার থেরাপির ওপরই সবচেয়ে বেশি আস্থা রাখেন। আধ্যাত্মিক চর্চার প্রতি আগ্রহ থাকলেও, মানসিক স্বাস্থ্য ও বাস্তবসম্মত আলোচনার গুরুত্ব তাঁদের কাছে কমেনি। দিনশেষে ভালোবাসা কোনো জাদুমন্ত্র বা চর্চার বিষয় নয়; বরং পারস্পরিক সম্মান, বিশ্বাস ও আলোচনার মাধ্যমেই একটি সুস্থ সম্পর্কের ভিত্তি তৈরি হয়। ডেটিং অ্যাপে হতাশা, জাদুবিদ্যায় বাড়তি আগ্রহ। শুধু স্বপ্ন দেখলেই কি মিলবে ভালোবাসা।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
- Harvard Business School, ২০১৪: Michael I. Norton ও Francesca Gino-এর Rituals Alleviate Grieving for Loved Ones, Lovers, and Lotteries গবেষণা। PubMed+1।
- Harvard ও UC Berkeley-এর গবেষক দল, ২০১৬: Don”t Stop Believing: Rituals Improve Performance by Decreasing Anxiety। faculty.haas.berkeley.edu।
- Gabriele Oettingen, ২০১৬: The Power of Prospection: Mental Contrasting and Behavior Change। Wiley Online Library।





