৮ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অণুবীক্ষণ জগতের ছবি তুলে বিশ্বসেরা বাংলাদেশি কুতুব উদ্দিন

প্রকাশ:

খালি চোখে যাদের দেখা প্রায় অসম্ভব, সেই খুদে অণুজীবদের জগতকে ক্যামেরায় বন্দি করে বিশ্বমঞ্চে অনন্য স্বীকৃতি পেয়েছেন কুতুব উদ্দিন। ২০২৬ সালে আয়োজিত ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের ৬২তম ‘ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফার অব দ্য ইয়ার’ প্রতিযোগিতায় পোর্টফোলিও বিভাগে বিজয়ী হয়েছেন এই যুক্তরাজ্যপ্রবাসী বাংলাদেশি। তাঁর তোলা ছবিগুলো মূলত স্লাইম মোল্ড নামক এক ধরনের অণুজীবকে ঘিরে, যা আর্দ্র পরিবেশে পচা কাঠের ওপর জন্মে। মাত্র ১ থেকে ২ মিলিমিটার আকারের এই জীবগুলো সচরাচর কারো নজর কাড়ে না, কিন্তু কুতুব উদ্দিনের ম্যাক্রো ফটোগ্রাফিতে এদের সূক্ষ্ম গঠন ও রঙের বিন্যাস ফুটে উঠেছে অসাধারণভাবে। যুক্তরাজ্যপ্রবাসী এই বাংলাদেশির গল্প শোনাচ্ছেন সজীব মিয়া। ছোট ছোট পোকামাকড়, ছত্রাক, স্লাইম মোল্ড এবং তাদের সূক্ষ্ম গঠন আমার আগ্রহের বিষয়।

কুতুবের পুরস্কারজয়ী এই ছবির সিরিজের নাম দেওয়া হয়েছে ‘সিক্রেট ওয়ার্ল্ড’। এতে মোট ছয়টি ছবি রয়েছে, যেখানে স্লাইম মোল্ডের প্রজননকাঠামোর বৈচিত্র্য উঠে এসেছে। এর মধ্যে ‘টাইনি ড্যান্সার’ বা ‘খুদে নৃত্যশিল্পী’ নামের ছবিতে হলুদাভ পিচ্ছিল স্তরের ওপর সরু লালচে-বাদামি ডাঁটার ওপর কালো ছোপ দেখা যায়, যা দেখে মনে হয় জীবগুলো যেন নাচছে। আবার ‘আ ওয়ার্ল্ড ইন মিনিয়েচার’ বা ‘ক্ষুদ্র এক জগৎ’ নামের ছবিতে শর্ষের দানার সমান একটি অণুজীবকে বনসাই করা গাছের মতো দেখাচ্ছে। ইংল্যান্ডের পশ্চিম সাসেক্সের বিভিন্ন বনাঞ্চলে এই ছবিগুলো ধারণ করেছেন তিনি। প্রতিটির মাথায় হলুদাভ গোলাকার অংশের ওপর ছড়িয়ে আছে কালো ছোপ। ধীরে ধীরে বুঝতে পারেন, আলোকচিত্র শুধু সুন্দর দৃশ্য ধরে রাখার মাধ্যম নয়, এর সাহায্যে এমন গল্পও বলা যায়, যা মানুষের অজানা। ভালো একটি ছবির জন্য কখনো ৫০, ১০০ কিংবা তারও বেশি ছবি তুলতে হয়। আমরা প্রতিদিন জঙ্গলে হাঁটি, গাছের গুঁড়ি দেখি, শুকনো পাতার ওপর দিয়ে চলি। কোনো কোনো জীবের গঠন দেখে মনে হয়, যেন অন্য কোনো গ্রহের প্রাণী।

মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় জন্ম নেওয়া কুতুব উদ্দিন ২০০৯ সালে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান। তবে শখকে পেশায় পরিণত করাটা সহজ ছিল না।

২০১২ সালে স্ত্রী জমিলা পারভিনের উপহার দেওয়া একটি ডিজিটাল ক্যামেরার হাত ধরেই তাঁর আলোকচিত্রের যাত্রা শুরু।

প্রথম দিকে শখের বসে মৌমাছি, ফুল বা প্রকৃতির ছবি তুললেও ধীরে ধীরে ম্যাক্রো ফটোগ্রাফির প্রেমে পড়ে যান তিনি।

২০১৮ সালে পেশাদার আলোকচিত্রী হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করা কুতুব এখন সামাজিক মাধ্যমে ‘ম্যাক্রোম্যান’ হিসেবে পরিচিত। বর্তমানে ক্যানন আর ৫ ক্যামেরা ও ক্যানন এমপি-ই ৬৫ মিলিমিটার ম্যাক্রো লেন্স ব্যবহার করে এক থেকে পাঁচ গুণ বিবর্ধিত ছবি তোলেন তিনি। ভালো একটি শট পেতে অনেক সময় ১২৪টির মতো ছবি ফোকাস স্ট্যাকিংয়ের মাধ্যমে একত্র করতে হয় তাঁকে। একসময় ছবি তোলাকে পেশা হিসেবে এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ছবি বিক্রি, আলোকচিত্রের কর্মশালা পরিচালনা এবং অন্যদের ছবি তোলা শেখানোর মাধ্যমে ধীরে ধীরে গড়ে তোলেন নিজের পরিচিতি। কুতুবের ভাষায়, ‘নিজের ভালোবাসার কাজকে পেশা হিসেবে নিতে পারাকে আমি সৌভাগ্য মনে করি। নিজের কাজের প্রচার, গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং ব্যবসার দিকটিও সামলাতে হয়।’। এই জগৎ আবিষ্কার করতে কুতুব উদ্দিনকে খুব দূরে যেতে হয় না।

কুতুব উদ্দিনের মতে, এই ধরণের ফটোগ্রাফিতে সরঞ্জামের চেয়েও বেশি প্রয়োজন ধৈর্য ও সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা। ২০২৪ সালের অক্টোবরে স্লাইম মোল্ড নিয়ে কাজ শুরু করে পুরো ২০২৫ সাল তিনি এদের জীবনচক্র বুঝতে ব্যয় করেছেন। এর আগের বছর, অর্থাৎ ২০২৫ সালেও একই প্রতিযোগিতায় তাঁর একটি ছবি ‘হাইলি কমেন্ডেড’ স্বীকৃতি পেয়েছিল। লন্ডনের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামে নিজের কাজ প্রদর্শিত হওয়াকে তিনি জীবনের অবিশ্বাস্য এক অভিজ্ঞতা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। দর্শকদের কৌতূহল ও প্রশংসা তাঁকে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করে। একটি কুরিয়ার সার্ভিসে ডেলিভারি ম্যানের কাজ করতেন, পাশাপাশি চালিয়ে গেছেন আলোকচিত্রে দক্ষতা বাড়ানোর চেষ্টা।

প্রকৃতিকে একদম কাছ থেকে দেখার নেশা থেকেই তিনি নিয়মিত পশ্চিম সাসেক্সের স্লিন্ডন উডস, পুলবরো ব্রুকস বা হেসওর্থ কমনের মতো বনাঞ্চলে ঘুরে বেড়ান। তাঁর লক্ষ্য, মানুষ যেন বড় প্রাণীর বাইরেও প্রকৃতির এই ক্ষুদ্র অথচ গুরুত্বপূর্ণ প্রাণীদের সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হয়। আগামী বছর বাংলাদেশে আসার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। দেশের প্রকৃতিতে থাকা এমন কিছু প্রজাতি, যা যুক্তরাজ্যে খুঁজে পাননি, সেগুলোর ছবি তোলার ব্যাপারে তিনি দারুণ আগ্রহী। পশ্চিম সাসেক্সে অর্জিত দীর্ঘ অভিজ্ঞতাকে তিনি বাংলাদেশের বৈচিত্র্যময় প্রকৃতিতে প্রয়োগ করতে চান।

শেয়ার করুন