৮ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

এনআইডি সংশোধন: ৬৪ লাখ আবেদন নিষ্পত্তিতে ইসির বড় সাফল্য

প্রকাশ:

জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) তথ্য সংশোধনের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত জমা পড়া ৬৫ লাখ ৭০ হাজার ৮৪২টি আবেদনের মধ্যে ৬৪ লাখ ৪২ হাজার ৮৩২টি নিষ্পত্তি করা হয়েছে। বিপুল এই সংখ্যা নিষ্পত্তির পরেও বর্তমানে ১ লাখ ২৮ হাজার ১০টি আবেদন অপেক্ষমাণ রয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন ত্রুটি বা অসংগতির কারণে এ পর্যন্ত ১৩ লাখ ৫৫ হাজার ১৫৭টি আবেদন বাতিল করতে হয়েছে। সম্প্রতি এ বিষয়ে সব আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তাকে চিঠি দিয়েছে ইসি। গত ১৩ থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সময়ের প্রতিবেদন ২১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। জালিয়াতির অভিযোগ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে সোপর্দ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, জালিয়াতির বিরুদ্ধে জনসচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যমে প্রচার চালানো হচ্ছে। তবে শুধু অভিযোগ পাওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে জালিয়াতির ঘটনা ঘটার আগেই তা প্রতিরোধের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

কার্যক্রমের অগ্রগতি ও বর্তমান চ্যালেঞ্জ

  • নিস্পত্তি করা আবেদন: ৬৪ লাখ ৪২ হাজার ৮৩২টি
  • অপেক্ষমাণ আবেদন: ১ লাখ ২৮ হাজার ১০টি
  • বাতিল হওয়া আবেদন: ১৩ লাখ ৫৫ হাজার ১৫৭টি
  • হালনাগাদ সময়কাল: ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত

ইসির জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪ সাল পর্যন্ত জমা পড়া এনআইডি সংশোধনের আবেদনগুলো ইতোমধ্যে নিষ্পত্তি সম্পন্ন হয়েছে। ২০২৫ সালের আবেদনের নিষ্পত্তিও এখন প্রায় শেষ পর্যায়ে। তবে প্রতি মাসে গড়ে ৮০ থেকে ৯০ হাজার নতুন আবেদন জমা পড়ায় অপেক্ষমাণ তালিকার আকার বড় হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কিছু সংশোধনের অযোগ্য আবেদন এবং একই বিষয়ে বারবার ভিন্ন ক্যাটাগরিতে আবেদন করার প্রবণতা, যা নিষ্পত্তির কাজকে জটিল করে তুলেছে। ইসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ‘ঘ’ ক্যাটাগরিতে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে ৬৮ হাজার ২৬৯টি আবেদন। পরবর্তী সময়ে প্রতি মাসের প্রতিবেদন পরের মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে পাঠাতে বলা হয়েছে।

আবেদন নিষ্পত্তিতে সময়সীমা ও প্রশাসনিক উদ্যোগ

  • নির্দিষ্ট সময়সীমা: আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বেঁধে দেওয়া হয়েছে সময়সীমা।
  • মাঠপর্যায়ে ক্ষমতা: উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে নিষ্পত্তির সুযোগ ও ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে।
  • তদারকি: সিনিয়র ম্যানেজমেন্ট এবং পরিচালকদের নিয়মিত কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।

ইসি সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, নির্ভুল ভোটার নিবন্ধন নিশ্চিত করাই তাদের মূল লক্ষ্য, যাতে ভবিষ্যতে সংশোধনের প্রয়োজন না পড়ে। অতীতে অযৌক্তিক আবেদন যাচাইয়ে ঘাটতি থাকলেও এখন কঠোর মানদণ্ড অনুসরণ করা হচ্ছে। বিশেষ করে বিদেশে অবস্থানরত ভোটারদের তথ্যের অসংগতি যাচাই করা হচ্ছে। এছাড়া জালিয়াতি রুখতে নিয়মিত প্রচারণার পাশাপাশি প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা চালুর বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে কমিশন। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সেবার মানসিকতা ও দায়িত্ববোধের পাশাপাশি নিয়মিত তদারকিও নিষ্পত্তির অগ্রগতিতে ভূমিকা রেখেছে।

জন্মতারিখ সংশোধনের ক্ষেত্রে এখন অনলাইনে যাচাইযোগ্য শিক্ষাসনদকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে কমিশন।

গত ১৩ আগস্ট জারি করা পরিপত্র অনুযায়ী, জেএসসি বা মাধ্যমিকের মতো অনলাইনে যাচাইযোগ্য সনদের ভিত্তিতে জন্মতারিখ সংশোধনের আবেদনগুলো ‘ক’ ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত করে উপজেলা বা থানা নির্বাচন কর্মকর্তারা নিষ্পত্তি করছেন। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তারা অধীনস্থ কর্মকর্তাদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করবেন।

তবে এতে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ কার্যকর নয়।

এই প্রক্রিয়ায় কর্মকর্তাদের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে প্রতি মাসে অন্তত তিনটি আবেদন দৈবচয়ন ভিত্তিতে যাচাই করে প্রতিবেদন পাঠানোর নির্দেশনা রয়েছে।

জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের পরিচালক (অপারেশন্স) মো. সাইফুল ইসলাম জানান, অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় বাবা ও সন্তানের বয়সের ব্যবধান ১০ বছরের কম কিংবা ভোটার হওয়ার সময় বয়স ১৮ বছরের নিচে ছিল, যা আইনত গ্রহণযোগ্য নয়।

এসব অসংগতিপূর্ণ আবেদন বাতিল করা হচ্ছে।

তিনি আরও জানান, কোনো আবেদন একবার বাতিল হলে অনেকে নতুন ক্যাটাগরিতে বারবার আবেদনের চেষ্টা করেন, যা কাজের চাপ বাড়ায়।

এই প্রতারক চক্রের প্রলোভনে যাতে সাধারণ মানুষ পা না দেয়, সেজন্য হেল্পডেস্কের মাধ্যমে নিয়মিত পরামর্শ ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম চলছে। এদিকে, সাধারণ মানুষকে প্রতারক চক্রের প্রলোভনে পা না দিতে সতর্ক করছে এনআইডি বিভাগ।

বর্তমানে ‘ঘ’ ক্যাটাগরিতেই সারা দেশে ৬৯ হাজার ২৫২টি আবেদন নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা অঞ্চলে ১০ হাজার ৬১৫টি এবং কুমিল্লা অঞ্চলে ১০ হাজার ৫৫৯টি আবেদন রয়েছে, যা তুলনামূলক বেশি। নির্বাচন সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, কেবল নিষ্পত্তির গতি বাড়ালেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। বরং নতুন নিবন্ধনের সময় নির্ভুল তথ্য নিশ্চিত করা এবং আবেদনকারীদের সচেতন করাই এখন নির্বাচন কমিশনের দীর্ঘমেয়াদী বড় চ্যালেঞ্জ। অঞ্চলভিত্তিক হিসাবে ঢাকা অঞ্চলে ১০ হাজার ৬১৫টি, ফরিদপুরে ৫ হাজার ১৪০টি, খুলনায় ৫ হাজার ৮৭১টি, ময়মনসিংহে ৮ হাজার ৩৩২টি এবং রংপুরে ৪ হাজার ৪৭৭টি আবেদন অপেক্ষমাণ রয়েছে। এছাড়া সিলেটে ৬ হাজার ৪৬৯টি, রাজশাহীতে ৬ হাজার ৮৭৫টি, বরিশালে ৪ হাজার ২২৬টি, চট্টগ্রামে ৬ হাজার ৬৮৮টি এবং কুমিল্লায় ১০ হাজার ৫৫৯টি আবেদন নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।

শেয়ার করুন