১৯ আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নেত্রকোণায় মোহনগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ৩০ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে শোকজ

প্রকাশ:

নেত্রকোণার মোহনগঞ্জ ১০০ শয্যা বিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মরত ৩০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ বা শোকজ করেছে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ। গত ২৩ সেপ্টেম্বর জেলা সিভিল সার্জন ডা. গোলাম মাওলা নঈম স্বাক্ষরিত এই সংক্রান্ত চিঠিটি গত ২৬ সেপ্টেম্বর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পৌঁছায়। শোকজপ্রাপ্তদের আগামী ৭ কর্মদিবসের মধ্যে লিখিতভাবে এর জবাব জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তারা যথাসময়ে নোটিশের জবাব দিবেন বলে জানান।

অভিযোগে বলা হয়েছে, গত ১৬ সেপ্টেম্বর সোমবার অফিস চলাকালীন সময়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার অনুমতি ছাড়াই হাসপাতালের হলরুমে কিছু চিকিৎসক, কর্মকর্তা ও নার্স রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা বহির্ভূতভাবে গোপন বৈঠক করেছেন। কর্তৃপক্ষের নজরে আসার পর এই শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়। শোকজ নোটিশে তাদের বিরুদ্ধে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে আন্দোলন, বিদ্রোহ, চেইন অব কমান্ড বিনষ্ট, কনফারেন্স রুম দখল, সরকারি সম্পদের অবৈধ ব্যবহার, দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা, ইচ্ছাকৃত গাফিলতি, আচরণবিধি লঙ্ঘন ও ষড়যন্ত্রের মতো গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে।

শোকজ পাওয়া কর্মকর্তাদের তালিকায় ১১ জন মেডিকেল অফিসার রয়েছেন। তারা হলেন—ডা. পার্থ সরকার, ডা. জান্নাতুল নেছা, ডা. মো. সায়েম, ডা. রাকিবুল ইসলাম, ডা. মো. অন্তিম হাসান, ডা. জয়া রানী দেবনাথ, ডা. মৌমিতা দাস, ডা. লিজা সরকার, ডা. পার্থ প্রতিম সেন, ডা. সৌরভ আহমেদ শাকিল ও ডা. মেহেদী হাসান পিয়াস। এছাড়া ৯ জন নার্সসহ আরও ১০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে এই নোটিশ দেওয়া হয়েছে। নার্সদের মধ্যে রয়েছেন রেহেনা আক্তার খানম, মনি আক্তার, রীনা রাণী পাল, মনিরা আক্তার, সাবিকুন্নাহার, হিমা আক্তার, উম্মে হাবিবা সরকার, নূরে ফারজানা ও জান্নাতুল ফেরদৌস। অন্যান্যদের মধ্যে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নাজমুল ইসলাম ও রেজুয়ান করিম রাজু, ফার্মাসিস্ট বাহারুল্লাহ, হিসাব রক্ষক শামছুল হুদা, স্যাকমো শহীদুর রহমান, বিপ্লব হোসেন, শাহজাহান সিরাজ, আলমগীর হোসেন, সিএইচসিপি মুশফিকুর রহমান বকুল ও অফিস সহায়ক মো. মুকুল রয়েছেন। অন্যান্য: মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ডেন্টাল) নাজমুল ইসলাম, এমটি ল্যাব রেজুয়ান করিম রাজু, ফার্মাসিস্ট বাহারুল্লাহ, হিসাব রক্ষক শামছুল হুদা, ৪ জন স্যাকমো- শহীদুর রহমান, বিপ্লব হোসেন, শাহজাহান সিরাজ, আলমগীর হোসেন, সিএইচসিপি মুশ।

নোটিশ পাওয়ার পর অভিযুক্তদের মধ্যে একাধিক ব্যক্তির সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা এ বিষয়ে বিস্তারিত কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান। তবে তারা জানিয়েছেন, শোকজ নোটিশ পাওয়ার মানেই কেউ দোষী সাব্যস্ত হওয়া নয় এবং তারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই যথাযথ উত্তর দেবেন।

এদিকে, হাসপাতালটিতে সেবার মান ও অনিয়ম নিয়ে রোগীদের বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। হাসপাতালের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, প্রতিদিন চিকিৎসা চলাকালীন ওষুধ কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধিদের ভিড়ে ডাক্তার ও রোগীদের মধ্যে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়, যা চিকিৎসা সেবাকে ব্যাহত করছে। রোগীরা ডাক্তারের কাছে তাদের শারীরিক সমস্যার কথা খুলে বলতেও সংকোচ বোধ করেন।

হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা ভুক্তভোগী রাসেল জানান, টিকিটের লাইনে দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষ সেবা নেওয়ার চেষ্টা করলেও কিছু ব্যক্তি লাইন ছাড়াই ভেতরে প্রবেশ করে টিকিট সংগ্রহ করছেন। এছাড়া ডাক্তারের কাছে একাধিক সমস্যার কথা বললে মাত্র একটি সমস্যার বিপরীতে তিনটি করে ওষুধ লিখে দেওয়া হয়, যার বেশিরভাগই হাসপাতাল থেকে পাওয়া যায় না। শামীমা আক্তার নামে আরেক রোগী অভিযোগ করেন, হাসপাতালে উন্নত যন্ত্রপাতি থাকা সত্ত্বেও অধিকাংশ পরীক্ষা বাইরের ক্লিনিকে করতে হয় এবং নির্দিষ্ট ক্লিনিক ছাড়া অন্য কোথাও পরীক্ষা করতে নিষেধ করা হয়। কিন্তু কিছু লোক লাইন ছাড়াই ভিতরে প্রবেশ করে টিকিট নিচ্ছে।

হাসপাতালের পরিবেশ নিয়েও রোগীদের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ওয়ার্ড ও ওয়াশরুমে নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় না রাখায় তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে এবং ওয়াশরুমের পাশে ময়লা-আবর্জনা জমে থাকে। স্থানীয়ভাবে পর্যাপ্ত পরিচ্ছন্নতাকর্মীর অভাবকেই এর মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। হাসপাতালে ভর্তি রোগীরা জানান, পর্যাপ্ত পরিচ্ছন্নতাকর্মী না থাকায় ওয়ার্ড ও ওয়াশরুম নিয়মিত পরিষ্কার হয় না।

ঘটনার বিষয়ে মোহনগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ডা. অলক কান্তি তালুকদার জানান, তিনি সিভিল সার্জনের চিঠি শনিবার গ্রহণ করেছেন এবং সংশ্লিষ্টদের তা বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। তদন্তের মাধ্যমেই বেরিয়ে আসবে আসলে কারা, কী উদ্দেশ্যে ওই গোপন সভার আয়োজন করেছিলেন।

শেয়ার করুন