দেশের উচ্চশিক্ষায় নতুন দিগন্ত উন্মোচনে সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দেশের ৫০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে তৃতীয় ভাষা শিক্ষা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ বছরের ডিসেম্বর মাসের মধ্যেই এই কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সদস্য অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ-আল-মামুন। শনিবার রাজধানীর বসুন্ধরা ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটিতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও চীনের ইউনান মিনজু বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ‘কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এ তথ্য জানান।
অধ্যাপক মামুন জানান, বর্তমানের আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বে শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ও পেশাগত সুযোগ বৃদ্ধিতে অতিরিক্ত একটি ভাষার দক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী ম্যান্ডারিন (চীনা), জাপানিজ, জার্মান, কোরিয়ান ও আরবি ভাষাসহ বিভিন্ন তৃতীয় ভাষার সম্প্রসারণকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দেশের সব বিভাগীয় অঞ্চলের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এই কার্যক্রমের আওতায় আনা হবে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে বিদেশি ভাষা বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় শিক্ষকদের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় উপকরণের জোগান দিতে সংশ্লিষ্ট দূতাবাসগুলোর সঙ্গে ইউজিসি কাজ করছে। বিশেষ করে ম্যান্ডারিন ভাষার ক্ষেত্রে চীনের দূতাবাসের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। অধ্যাপক মামুন বলেন, বর্তমান বিশ্ব ক্রমেই আন্তঃসংযুক্ত হয়ে উঠছে।
উচ্চশিক্ষার আন্তর্জাতিকীকরণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে ইউজিসি সদস্য বলেন, তৃতীয় ভাষা শিক্ষার ফলে শিক্ষার্থীরা বিদেশে বৃত্তি, শিক্ষার্থী বিনিময় কর্মসূচি, যৌথ একাডেমিক ডিগ্রি, ফেলোশিপ এবং আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণের ব্যাপক সুযোগ পাবেন। বাংলাদেশকে উচ্চশিক্ষার একটি আঞ্চলিক হাব হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিভিন্ন বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে দ্বৈত ডিগ্রি চালু নিয়েও ইউজিসি কাজ করছে। এটি বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত হতে সহায়তা করবে।
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে এই উদ্যোগের প্রভাব নিয়ে অধ্যাপক মামুন বলেন, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক এখন বাণিজ্য, অবকাঠামো, প্রযুক্তি, প্রকৌশল এবং তথ্যপ্রযুক্তির মতো বহুমুখী খাতে বিস্তৃত। স্নাতকদের নিজ বিষয়ের জ্ঞানের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ভাষা জানা থাকলে বিদেশের শ্রমবাজারে তাদের কাজের সুযোগ অনেক বেড়ে যাবে। তাই তৃতীয় ভাষা শিক্ষাকে নিছক পাঠ্যক্রম নয়, বরং কর্মসংস্থানযোগ্যতা বৃদ্ধির কৌশল হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
গবেষণার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও চীনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে সহযোগিতা আরও বিস্তৃত করার আহ্বান জানান তিনি। অধ্যাপক মামুন বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কৃষি, জলবায়ু, জীবপ্রযুক্তি ও জনস্বাস্থ্যের মতো বিষয়ে যৌথ গবেষণা ও একাডেমিক সম্পর্ক স্থাপনে কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করতে পারে। তিনি আরও বলেন, দেশের উচ্চশিক্ষা খাতে ‘ব্রেইন ড্রেইন’ বা মেধা পাচারের পরিবর্তে ‘ব্রেইন সার্কুলেশন’ নিশ্চিত করতে বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি গবেষক ও পেশাজীবীদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় যুক্ত করা জরুরি। ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি বা সামার স্কুলের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ককে কাজে লাগানো সম্ভব।
কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউটের গুরুত্ব তুলে ধরে অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ-আল-মামুন বলেন, এটি শুধু ভাষা শেখার কেন্দ্র নয়, বরং এটি সংস্কৃতি বিনিময়ের একটি প্রবেশদ্বার। এর মাধ্যমে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা যেমন চীনা ভাষা, ইতিহাস ও সাহিত্য জানতে পারবেন, তেমনি চীনা শিক্ষার্থী ও গবেষকরা বাংলাদেশের সমাজ ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানবেন। তিনি এই ইনস্টিটিউটকে শিক্ষার্থী-শিক্ষক বিনিময়, বৃত্তি প্রদান এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের একটি মডেল হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সিপিসি ইউনান প্রাদেশিক কমিটির স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য ঝাও জুনমিন। এছাড়াও বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল-ফোরকান, ইউনান মিনজু বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্টি কমিটির সম্পাদক রুয়ান চাওছি, বিকেএসপির মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ সাইফ উল্লাহসহ বিশিষ্টজনরা।
সবশেষে ইউজিসি সদস্য বলেন, এই উদ্যোগের মাধ্যমে ভাষার সঙ্গে শিক্ষা, গবেষণার সঙ্গে উদ্ভাবন এবং দক্ষতার সঙ্গে আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থানের মেলবন্ধন তৈরি হবে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট এই যাত্রায় একটি নতুন পথপ্রদর্শক হিসেবে ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।





