কক্সবাজারের টেকনাফের দুর্গম পাহাড়ে মানবপাচারকারী চক্রের আস্তানায় জিম্মিদের উদ্ধারে পরিচালিত যৌথ অভিযানে সন্ত্রাসীদের গুলিতে শহীদ হয়েছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্য মো. তিতাস শেখ (২৮)। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সন্ধ্যায় রামু সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। ছেলের এমন অকাল প্রয়াণের খবরে ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়া গ্রামে শোকের মাতম চলছে।
আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার বিকেলে টেকনাফের রঙ্গীখালী এলাকায় মালয়েশিয়াগামী রোহিঙ্গাদের উদ্ধার করতে যৌথ অভিযান শুরু হয়। সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ ও ১৬ এপিবিএন-এর সমন্বয়ে চালানো এই অভিযানের লক্ষ্য ছিল জিম্মি থাকা প্রায় ১২০ জনকে উদ্ধার করা। বিকেল সাড়ে ৪টা থেকে ৫টার মধ্যে যৌথ বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছালে পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা অতর্কিত গুলি চালায়। এ সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন তিতাস। তাঁর বুকের বাঁ পাশে ও কাঁধে গুলি লাগে।
আহতের পর তাঁকে প্রথমে লেদা আইআরসি রোহিঙ্গা হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য বেসামরিক অ্যাম্বুলেন্সে রামু সিএমএইচে নেওয়া হলে রাত ৮টা ৪৮ মিনিটে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। এই অভিযানে ৫৭ জন জিম্মিকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে এবং মানবপাচারকারী চক্রের পাঁচ সদস্যকে আটক করা হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে একটি পিস্তল, একটি দেশীয় বন্দুক ও চার রাউন্ড গুলি জব্দ করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
শহীদ তিতাস শেখ নগরকান্দার লস্করদিয়া গ্রামের আফজাল হোসেন ও রেখা বেগম দম্পতির বড় সন্তান। তিনি সেনাবাহিনীর ১ বীর ইউনিটের সদস্য হিসেবে রঙ্গীখালী আর্মি ক্যাম্পে দায়িত্বরত ছিলেন। তাঁর বাবা আফজাল হোসেন নিজেও একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য এবং ছোট ভাই আকরাম হোসেনও সেনাবাহিনীতে কর্মরত। ২০১৭ সালে তিতাস সৈনিক পদে চাকরিতে যোগ দেন। চার বছর আগে তিনি পাশের বারখাদিয়া গ্রামের সুমাইয়া আক্তারকে বিয়ে করেন। আগামী ডিসেম্বরে স্ত্রীকে নিজের কর্মস্থলে নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল তাঁর, কিন্তু সেই স্বপ্ন অধরাই রয়ে গেল। কিন্তু দেশের জন্য দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রাণ হারানোয় অপূর্ণই থেকে গেল তাঁদের একসঙ্গে থাকার স্বপ্ন। দেশের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে প্রাণ হারানো তিতাস শেখের মৃত্যুতে শোকাহত পরিবার, স্বজন ও এলাকাবাসী।
ছেলের শেষ সময়ের কথা স্মরণ করে মা রেখা বেগম জানান, বুধবার রাতেও তিতাসের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা হয়। তখন সে বলেছিল, ‘আগামীকাল বিকেলে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযানে যাচ্ছি, আমার জন্য দোয়া করো মা।’ মায়ের কাছে চাওয়া সেই দোয়াটুকুই ছিল তিতাসের সঙ্গে শেষ কথোপকথন। বৃহস্পতিবার অভিযানের সংবাদে পরিবারের সদস্যরা মর্মাহত হয়ে পড়েন। তিতাসের মা রেখা বেগমের কাছে এখনো ছেলের শেষ কথাগুলোই বারবার ফিরে আসছে।
পারিবারিক ও প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, রামু সিএমএইচ থেকে ছোট ভাই আকরাম হোসেন তিতাসের মরদেহ গ্রহণের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন। শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে সেনাবাহিনীর ব্যবস্থাপনায় হেলিকপ্টারে তাঁর মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা আফরিন জানিয়েছেন, সেনাবাহিনীর আনুষ্ঠানিকতা শেষে বিকাল ৪টার দিকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার প্রদান করা হবে। এরপর লস্করদিয়া গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হবে। দেশের নিরাপত্তা ও শান্তি রক্ষায় জীবন উৎসর্গ করা এই বীর সেনার মৃত্যুতে পুরো এলাকা জুড়ে গভীর শোকের পরিবেশ বিরাজ করছে। শুক্রবার (৬ নভেম্বর) বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে সেনাবাহিনীর ব্যবস্থাপনায় হেলিকপ্টারে তিতাসের মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে বাড়ির পরিবেশ। একদিকে দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করা এক বীর সেনাসদস্যের গর্ব, অন্যদিকে সন্তান, স্বামী ও ভাইকে হারানোর গভীর বেদনা। এই দুই অনুভূতিতে স্তব্ধ হয়ে আছে তাঁর গ্রামের বাড়ি।





