প্রকৃতির স্বাভাবিক গতিপথকে উপেক্ষা করে বছরের পর বছর ধরে চলা অপরিকল্পিত নগরায়ণ, নির্বিচারে পাহাড় কাটা, নদী-খাল ও জলাশয় দখল এবং জলাভূমি ভরাটের চরম মাশুল দিচ্ছে বাংলাদেশ। টানা ভারী বর্ষণে দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র-রাজধানী ঢাকা ও বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম একযোগে জলমগ্ন হয়ে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। একই সাথে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য অঞ্চলে পাহাড় কেটে গড়ে তোলা ঝুঁকিপূর্ণ বসতিগুলোতে বর্ষার শুরুতেই দেখা দিয়েছে প্রাণঘাতী ভূমিধসের মারাত্মক আশঙ্কা। এই পরিস্থিতির মধ্যেই ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের ‘গ্লোবাল লিভেবিলিটি ইনডেক্স ২০২৬’-এ ঢাকাকে বিশ্বের ১৭৩টি শহরের মধ্যে ১৭১তম স্থান দেওয়া হয়েছে, যেখানে অবকাঠামোগত সক্ষমতার স্কোর ১০০-এর মধ্যে মাত্র ২৭।
সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে শনিবার রাত থেকে শুরু হওয়া বিরতিহীন ভারী বর্ষণে রাজধানীর বেশির ভাগ সড়ক খাল-নালায় পরিণত হয়। আবহাওয়া অধিদফতরের তথ্যমতে, গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকায় ৯৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যার মধ্যে ৬ ঘণ্টায় ছিল ৭৬ মিলিমিটার। মতিঝিল, আরামবাগ, শান্তিনগর, ধানমন্ডি, মিরপুর ও মহাখালী থেকে বিমানবন্দর সড়কসহ বিস্তীর্ণ এলাকা হাঁটু থেকে কোমরসমান পানিতে তলিয়ে যায়। বহু স্থানে ড্রেনের নোংরা পানি উপচে পড়ায় স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়েছে। গণপরিবহনের তীব্র সংকটে হাজার হাজার মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েন এবং রিকশা ও ভ্যানচালকরা যাত্রীদের কাছ থেকে অস্বাভাবিক ভাড়া আদায় করেন। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরীক্ষা স্থগিত করা হয় এবং অ্যাম্বুলেন্স চলাচল ব্যাহত হওয়ায় রোগী ও স্বজনরা দুর্ভোগে পড়েন। সিটি করপোরেশন খাল উদ্ধারের দাবি করলেও ড্রেনে জমে থাকা প্লাস্টিক ও কঠিন বর্জ্যের কারণে পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামের পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি নগরীতে ২৪ ঘণ্টায় ১৬৯.৮ মিলিমিটার এবং অতিসম্প্রতি ৪১২ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। কাতালগঞ্জ, পাঁচলাইশ, চকবাজার ও বহদ্দারহাটসহ নিচু এলাকাগুলো তলিয়ে যাওয়ায় চট্টগ্রাম বিমানবন্দর ও ট্রেন চলাচল সাময়িকভাবে ব্যাহত হয়েছে। বন্দর থেকে পণ্যবাহী যান চলাচলও স্তব্ধ হয়ে পড়ে।
চট্টগ্রামের সংকট কেবল অতি বৃষ্টির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; পাহাড় কাটা ও বন উজাড়ের কারণে ভূমিধসের ঝুঁকি চরমে পৌঁছেছে। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে চট্টগ্রাম শহরে ২০০টিরও বেশি পাহাড় থাকলেও গত অর্ধশতকে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক স্বার্থে শতাধিক পাহাড় বিলীন হয়ে গেছে। একই রকম পরিবেশগত বিপর্যয় দেখা দিয়েছে কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ এলাকায়। সেখানে প্রায় আট হাজার একর বনভূমি উজাড় করে ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর বসতি গড়ে তোলায় মাটির প্রাকৃতিক বাঁধন দুর্বল হয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় বৃক্ষরোপণ ও পরিবেশ সুরক্ষা কার্যক্রম থমকে যাওয়ায় সেখানে বড় ধরনের ভূমিধসের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।





