যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল সম্পর্কের নতুন সমীকরণ: কৌশলগত অংশীদারত্বের দিকে যাত্রা

প্রকাশ:

ওয়াশিংটনের অনেক বাস্তববাদী পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক ও কৌশলবিদ মনে করেন, ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যকার ব্যক্তিত্বের সঙ্ঘাত বা কূটনৈতিক মতদ্বৈধতাকে ‘জোট ভেঙে যাওয়া’ হিসেবে দেখা অতিরঞ্জন। দুই দেশের সামরিক, সাইবার ও গোয়েন্দা কাঠামোর মধ্যকার প্রাতিষ্ঠানিক বন্ধন এখনো বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী অক্ষ হিসেবে টিকে আছে। তবে ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে বিশ্ব ভূরাজনীতিতে নজিরবিহীন পরিবর্তনের আভাস স্পষ্ট হচ্ছে, যেখানে মার্কিন প্রশাসন ইসরাইলকে শীর্ষ কৌশলগত মিত্রের অবস্থান থেকে কিছুটা ‘ডাউনগ্রেড’ করার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জটিল সমীকরণে সরাসরি জোট ভেঙে যাওয়া বা ইসরাইলকে গুরুত্বহীন ঘোষণা করার মতো পরিস্থিতি তৈরি না হলেও, সম্পর্কটি অতীতের স্বতঃস্ফূর্ত ‘বিশেষ সম্পর্ক’ থেকে ‘শর্তসাপেক্ষ কৌশলগত অংশীদারত্বে’ পরিণত হওয়ার পথে। গাজাযুদ্ধ এবং ইরানবিষয়ক ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন ভূরাজনৈতিক কৌশল এই পরিবর্তনের মূল উৎস। ওয়াশিংটন এখন নিজের বৈশ্বিক অবস্থান অক্ষুণ্ন রাখা এবং মধ্যপ্রাচ্যে চীন ও রাশিয়ার প্রভাব রোধকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ পাওয়া গেছে ২০২৬ সালের জুন মাসে অনুষ্ঠিত মার্কিন-ইরান পরোক্ষ সমঝোতা সংলাপে, যেখানে ইসরাইলকে আলোচনার অংশ করা হয়নি। এছাড়া ১০ আগস্ট ২০২৬-এ হোয়াইট হাউজ সমর্থিত ১৫ দফার গাজা শান্তি প্রস্তাব নেতানিয়াহু প্রত্যাখ্যান করলেও ট্রাম্প প্রশাসন তাদের সিদ্ধান্তে অনড় থেকেছে। এটি বার্তা দিচ্ছে যে, মার্কিন স্বার্থের সাথে সাংঘর্ষিক হলে ওয়াশিংটন এখন ইসরাইলকে পাশ কাটিয়ে নিজস্ব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রস্তুত।

তবে এই পরিবর্তনকে ‘ডাউনগ্রেড’ না বলে বরং ‘রি-ক্লাসিফিকেশন’ বা পুনর্শ্রেণিবিন্যাস বলাই অধিক যুক্তিযুক্ত। মার্কিন কংগ্রেশনাল রিসার্চ সার্ভিসের (সিআরএস) জুলাই ২০২৬-এর মূল্যায়ন অনুযায়ী, দুই দেশের সামরিক ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলো প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে যুক্ত। মে ২০২৬ থেকে দুই দেশ ২০২৮ সাল পরবর্তী নতুন নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে, যার লক্ষ্য হলো কেবল অনুদান-নির্ভর সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে যৌথ গবেষণা ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে পারস্পরিক স্বনির্ভর অংশীদারত্ব প্রতিষ্ঠা করা।

ওয়াশিংটনের নতুন দৃষ্টিভঙ্গির তিনটি মূল স্তর রয়েছে: ১. ইসরাইল-কেন্দ্রিক থেকে মার্কিন-কেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি: আগে ওয়াশিংটনের মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে ইসরাইলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ছিল প্রায় স্বয়ংক্রিয় ও সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। কিন্তু বর্তমানে ট্রাম্প প্রশাসন ইসরাইলের নিরাপত্তাকে মার্কিন বৃহত্তর বিশ্বকৌশল ও আঞ্চলিক লক্ষ্য ইরানের সাথে ভারসাম্য রক্ষা, উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা, ও অন্যান্য বিষয়ের সাথে সমন্বয় করছে। ২. ব্ল্যাঙ্ক চেক থেকে শর্তসাপেক্ষ অংশীদারত্ব: ইসরাইলের নিরাপত্তা ও অস্তিত্বের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক অঙ্গীকার বজায় থাকলেও, সেই সমর্থনের বিনিময়ে ওয়াশিংটন এখন ইসরাইলি সরকারের কাছ থেকে দায়িত্বশীল ও সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক আচরণ প্রত্যাশা করছে। বিশেষ করে গাজায় মানবিক সঙ্কট সামাল দেয়া, লেবানন সীমান্ত স্থিতিশীল রাখা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এর অন্তর্ভুক্ত। ৩. একচ্ছত্র ইসরাইল-নির্ভরতা থেকে নেটওয়ার্কড মধ্যপ্রাচ্য: যুক্তরাষ্ট্র এখন কেবল ইসরাইলকে মধ্যপ্রাচ্যের একমাত্র ভরসা বা আঞ্চলিক পুলিশ হিসেবে না দেখে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), কাতার, এমনকি তুরস্কের মতো একাধিক প্রভাবশালী আঞ্চলিক শক্তিকে একই নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক কাঠামোর অধীনে আনতে চাইছে। এর ফলে সামগ্রিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন প্রভাব আরও সুসংহত হবে। ২০২৮ সালের নতুন ১০ বছর মেয়াদি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের সময় এই সম্পর্কের প্রকৃত দিকনির্দেশনা স্পষ্ট হবে। ডেমোক্র্যাটিক পার্টির জ্যেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব রাহম ইমানুয়েলও জুলাই ২০২৬-এ সতর্ক করেছেন যে, ইসরাইল তার ফিলিস্তিনসংক্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন না করলে ওয়াশিংটনের ঐতিহ্যগত সমর্থনভিত্তি ঝুঁকিতে পড়তে পারে। সব মিলিয়ে, ইসরাইলকে এমন এক বৃহৎ কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা চলছে যেখানে দেশটি নিজের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির স্বার্থে একতরফাভাবে মার্কিন নীতিকে প্রভাবিত করতে পারবে না।

শেয়ার করুন