শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা ও বাস্তবতার ধোঁয়াশা

প্রকাশ:

গত ৯ জুলাই রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা ঘোষণা দিয়েছেন যে, তিনি আগামী ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফিরবেন। তার এই বক্তব্য নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনসহ সব মহলে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ সময় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা শেখ হাসিনা সবসময়ই আলোচনায় থাকতে পছন্দ করেন, আর সেই নীরবতা ভাঙার লক্ষ্যেই হয়তো তিনি এই মন্তব্য করেছেন। এসব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে আওয়ামী লীগ পরবর্তী তিনটি নির্বাচনে (২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪) প্রহসন করে জয়ী হয়।

২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নির্বাচনের পর টানা সাড়ে ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকাকালে শেখ হাসিনা তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল, দলীয়করণ, ভিন্নমতের ওপর দমন-পীড়ন এবং গুম-খুনসহ নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে চূড়ান্তভাবে ছাত্র-জনতার বাঁধভাঙা জোয়ার গণভবন অভিমুখে চলে এলে শেখ হাসিনা নিরাপত্তাবাহিনীর সহযোগিতায় হেলিকপ্টারে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার আগে তার শাসনামলে প্রায় ১,৪০০ মানুষ নিহত এবং ২০ হাজার মানুষ আহত হয়। বর্তমানে তার বিরুদ্ধে প্রায় ৬০০ মামলা রয়েছে, যার মধ্যে ৫০০টি হত্যা মামলা। ইতোমধ্যে একটি মামলায় তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে এবং অনেক মামলায় রয়েছে গ্রেফতারি পরোয়ানা।

বাস্তবতা হলো, সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করলেই আইন অনুযায়ী তাকে গ্রেফতার হতে হবে। দেড় দশক ক্ষমতার জৌলুশ ভোগ করা একজন ব্যক্তি স্বেচ্ছায় জেলে ফিরতে চাইবেন কি না, তা নিয়ে ঘোরতর সন্দেহ রয়েছে। এছাড়া তার সাথে পরিবার-পরিজন, মসজিদ কমিটিগুলোর নেতা থেকে শুরু করে ৩০০ এমপি, মন্ত্রী, নেতাকর্মী পালিয়ে যাওয়ায় এবং আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বর্তমানে কার্যত স্থবির হয়ে পড়ায় তার ফেরা নিয়ে নানা জটিলতা তৈরি হয়েছে।

কূটনৈতিকভাবেও বিষয়টি বেশ স্পর্শকাতর। শেখ হাসিনার বৈধ পাসপোর্ট নেই এবং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে তার প্রত্যাবর্তন একটি বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভারত তার নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে তাকে ফেরত পাঠাবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। তাছাড়া বিএনপি ও জামায়াতের মতো রাজনৈতিক শক্তিগুলোও এই পরিস্থিতিতে নিজেদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করতে পারে।

২০২৪ সালে ১৬-২১ জুন দেশে কোটাবিরোধী আন্দোলনে দেশব্যাপী ছাত্র-জনতাকে গণহত্যার সময় কয়েক দিন শেখ হাসিনা পর্দার আড়ালে ছিলেন। শেখ হাসিনার অতীত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি অতীতেও বিভিন্ন সময় স্ববিরোধী অবস্থান নিয়েছেন। ১৯৮৬ সালে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারীদের ‘জাতীয় বেঈমান’ আখ্যা দেওয়ার পর রাতে এরশাদের সাথে আঁতাত করা কিংবা নির্বাচনের আগে দেওয়া নানা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করার নজির তার রয়েছে। সম্প্রতি কোটাবিরোধী আন্দোলনের সময়ও তিনি নানা পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিয়েছেন।

উপসংহারে বলা যায়, কর্মীদের মনোবল চাঙ্গা রাখতে বা আলোচনার কেন্দ্রে থাকতে তিনি দেশে ফেরার এই ইঙ্গিত দিয়ে থাকতে পারেন। তবে রাজনীতির শেষ কথা বলে কিছু নেই বলে ডিসেম্বরের আগে পর্যন্ত পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয় এবং কূটনৈতিক অঙ্গনে কী ধরনের পরিবর্তন আসে, তার জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া গত্যন্তর নেই।

শেয়ার করুন