সংস্কারের পথে ষড়যন্ত্র ও বিভ্রান্তি এড়িয়ে লক্ষ্য অর্জনে অটল থাকতে হবে

প্রকাশ:

দেশের রাজনীতি, সমাজ ও অর্থনীতির সংস্কার সাধনে বর্তমানে এক বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। স্বৈরাচারী শাসনামলের দীর্ঘদিনের একচ্ছত্র শাসন, সাজানো প্রশাসন, শোষণ, লুটপাট ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ফলে গড়ে ওঠা সুবিধাভোগী গোষ্ঠী এখন নিজেদের আড়াল করতে পদে পদে বাধা সৃষ্টি করছে। তারা বিভিন্ন ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চালাচ্ছে। এমনকি নতুনরা নিজেরা শত্রু-মিত্র সেজে আত্মঘাতী পথ বেছে নিতে পারে কিংবা বৈষম্যের কথা বলে কোটারি সৃষ্টিতে মগ্ন হতে পারে। এই জটিল পরিস্থিতি ধৈর্যের সাথে মোকাবেলা করার কোনো বিকল্প নেই।

শিশুসাহিত্যিক যোগীন্দ্রনাথ সরকারের (১৮৬৬-১৯৩৭) কালজয়ী ছড়া ‘কাজের ছেলে’র কথা স্মরণ করলে দেখা যায়, পরিপার্শ্বের প্রভাবে মানুষের মনোযোগ বিভ্রান্ত হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তৎকালীন ঔপনিবেশিক রাজনীতির মনোজগৎ নিয়ে তির্যক মনোভাব প্রকাশ পেত এই রচনায়। তার বড় ভাই প্রখ্যাত চিকিৎসক নীলরতন সরকারের জ্ঞান অন্বেষণের ধারা থেকে জানা যায়, পরিপার্শ্ব মানুষের মনোযোগ বিভ্রান্ত করতে সদা প্রবহমান। আজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব ও বিভ্রান্তিকর বয়ান থেকে সাবধান থাকতে হবে। ব্যবসায়-বাণিজ্য, শিল্প উৎপাদন ও দেশী-বিদেশী বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরির প্রত্যাশা থাকলেও বাস্তবতায় শুল্ক ছাড় কিংবা শিল্প উৎপাদন পর্যায়ে তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও নীতিসহায়তার জগদ্দল পাথর সরানোর মতো সক্ষমতার অভাব দেখা যাচ্ছে। নেপথ্যের কুশীলবদের সবাই চিনলেও মাকড়সার মতো বোনা জটিল জাল ভেদ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

জুলাই অভ্যুত্থানের সময়কার অকুতোভয় পরিবেশ আজ যেন স্ববিরোধিতার গোলকধাঁধায় থমকে না যায়। কবি সুকান্তের ভাষায় ‘জ্বলে পুড়ে ছারখার তবু মাথা নোয়াবার নয়’—এই চেতনা ধরে রাখা জরুরি। অতীতে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চলের নামে জনগণকে বড় স্বপ্ন দেখালেও সরকারি পোষক প্রতিষ্ঠানের অবহেলা ও স্ববিরোধিতার কারণে বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা নাস্তানাবুদ হয়েছেন। সরকার নিজেই বিশাল শিল্পনগর প্রতিষ্ঠা করে বিদেশী কোম্পানিদের জন্য স্বল্পমূল্যে জমি ছেড়ে দেয়ায় বেসরকারি এসইজেডগুলো প্রতিযোগিতায় পড়ে গিয়েছিল। ডিজিটাল কার্যক্রমের নামে সাইবার সিকিউরিটির দোহাই দিয়ে তোষামোদি ও চাটুকারিতার চর্চা হয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের জন্য ঝামেলার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

যারা পালিয়ে বেঁচেছে, তারা সংখ্যায় কম নয় এবং তাদের কায়েমি স্বার্থবাদী সমর্থকরা নতুনদের ওপর দোষ চাপিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করতে পারে। অতীতে আয়নাঘর সৃষ্টির মাধ্যমে চরম অমানবিক আচরণ ও মৌলিক অধিকার হরণ করা হয়েছিল। এখন সেই স্বৈরাচারের প্রেতাত্মারা যেন নতুনদের বিপথগামী করতে না পারে, সেদিকে লক্ষ্য রাখা জরুরি। সবশেষে, শিক্ষাই শক্তি এবং সুস্বাস্থ্যই শক্তি। কোটাবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে অর্জিত অধিকার ধরে রাখতে মেধাবীদের নিজেদের যোগ্য হিসেবে গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। নীতিনির্ভরতায় থিতু হওয়ার সময় এখনো শেষ হয়ে যায়নি। মনে রাখতে হবে, পক্ষের সফলতাই বিপক্ষের পরাজয় নিশ্চিত করে, তাই বিভ্রান্তিতে না গিয়ে লক্ষ্য অর্জনে স্থির থাকা জরুরি।

শেয়ার করুন