জীবনের কৈশোর, তারুণ্য ও যৌবনের কর্মচাঞ্চল্য বয়সের সাথে সাথে লোপ পেতে পারে, কিন্তু অর্জিত অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞাকে কাজে লাগানোর সুযোগ কেন হাতছাড়া হবে? এজন্য প্রয়োজন সময়ের সুচিন্তিত ও সক্রিয় সদ্ব্যবহার। অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে কাজগুলো সম্পন্ন করলে মন পুনরায় তারুণ্যে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। বিশ্রাম যতটুকু প্রাপ্য ও প্রয়োজন ততটুকুই গ্রহণ করতে হবে, কিন্তু শয়তানের ইন্ধনে কোনো খোঁড়া যুক্তিতে বা শৃঙ্খলাহীনতায় নিজেকে সমর্পণ করা যাবে না। ভালো-মন্দ, উত্থান-পতনের প্রতিটি মুহূর্তে উজ্জ্বল চেতনা ও লক্ষ্য জাগ্রত রাখা জরুরি। ব্যর্থতার গ্লানিতে ডুবে না থেকে বরং ব্যর্থতাকে জয় করে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
সত্যের জয় মানেই মিথ্যার পরাজয়। বর্তমান সমাজ, রাষ্ট্র, রাজনীতি ও অর্থনীতিতে সত্য ও মিথ্যার যে চিরকালীন দ্বন্দ্ব, তা নীতিনৈতিকতার টানাপড়েনে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। জ্ঞান ও শিক্ষার মাধ্যমে আদমকে ফেরেশতাদের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান এবং ইবলিশ কর্তৃক সিজদাহ অস্বীকারের ঘটনাটি মানুষের জন্য এক বড় উপলব্ধির বিষয়। শয়তানের প্ররোচনায় আদম আ. ও বিবি হাওয়া আ.-এর আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করার পরিণতিতে বেহেশত থেকে বিতাড়িত হওয়া ছিল শয়তানের প্রথম বিজয়। আল্লাহ যুগে যুগে সত্যপথের দিকনির্দেশনা দিয়েছেন; যারা শয়তানের প্ররোচনায় এই নৈতিক বিধিবিধান প্রত্যাখ্যান করবে, তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে বা জাহান্নামের আগুনে পুড়বে। দৈনন্দিন জীবনে অন্যায় ও অনিয়ম মাথাচাড়া দিয়ে উঠলে শয়তানের পোয়াবারো হয়, তাই শয়তান যেন বারবার জিতে না যায় সেদিকে সজাগ থাকাই শান্তি ও সত্যের জয়ের পথে থাকা।
শিক্ষাবিদ, সমাজসেবক ও সুফি হিসেবে খ্যাত খানবাহাদুর আহছানউল্লাহ তার 'আমার জীবন ধারা' গ্রন্থের পরিশিষ্টে 'কতিপয় কূট প্রশ্নের সমাধান' শীর্ষক অধ্যায়ে 'শয়তান বলিতে কি বুঝি' পরিচ্ছেদে লিখেছেন, খোদা আদমের মধ্যে প্রবৃত্তির সৃষ্টি করেছিলেন এই উদ্দেশ্যে যে, আদম জাত অহরহ প্রবৃত্তির সম্মুখীন হয়েও শয়তানের ধোঁকা খেয়েও ফেরেশতার ঊর্ধ্বতন স্থান অধিকার করবে। তিনি রিপুকে শত্রু মনে করেন না, কারণ মানুষের মধ্যে কুপ্রবৃত্তি না থাকলে তার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হতো না। যিনি কুপ্রবৃত্তিকে দমন করতে পারেন, নফসকে বশীভূত করতে পারেন, তিনি ততই খোদার নৈকট্য লাভ করেন। শয়তান খোদার নৈকট্য লাভের সহায়-স্বরূপ, কারণ অন্ধকার না থাকলে যেমন আলোর বাহার বোঝা যায় না, তেমনি বদি না থাকলে নেকির বাহাদুরিও প্রকাশ পায় না।
সমাজে ও অর্থনীতিতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির যে চেষ্টা, তাকে এই নিরিখে দেখার অবকাশ রয়েছে। অশরীরী অপশক্তিকে রুখে দেওয়ার নামে শারীরিক অপশক্তির উদ্ভব ঘটছে এবং মিথ্যাকে পরাভূত করতে গিয়ে সত্যের অবক্ষয় থামানো যাচ্ছে না। দৈনন্দিন জীবনে ইবাদত, শরীরচর্চা বা দাফতরিক দায়িত্ব পালনে মনোযোগের অভাব ও শৈথিল্য দেখা দিলে একধরনের অতৃপ্তি ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। সুশৃঙ্খল কর্মপরিকল্পনার শিথিলতা ভবিষ্যতে অনুশোচনার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
দেশের বর্তমান ক্রান্তিকালে কর্মপরিবেশের অস্থিরতা বা অন্যের অসমর্থনযোগ্য আচরণে আহত না হয়ে নিজের কাজে একাগ্র হওয়া বাঞ্ছনীয়। জীবন সংগ্রামে টিকে থাকতে হলে চাই সবল মনোবল, যা ত্যাগ ও সহিষ্ণুতা ছাড়া অর্জিত হয় না। নিজের ব্যক্তিত্ব ও মর্যাদা সমুন্নত রেখে, আশপাশে ঘটে যাওয়া অন্যায় ও অনিয়মকে প্রশ্রয় না দিয়ে নিজের পড়াশোনা ও চিন্তাভাবনায় মনোযোগী হতে হবে। সময়ের ও সুযোগের সদ্ব্যবহারে সুগ্রথিত ও সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে আত্মবিশ্বাসে উচ্চশির থাকাই জীবনের প্রকৃত সার্থকতা।





