রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ও সাংবিধানিক নিয়োগ বিতর্ক

প্রকাশ:

বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন (চুপ্পু) তার কার্যকালে বিভিন্ন সময়ে দুর্নীতির অভিযোগ, সাংবিধানিক নিয়োগের বিতর্ক এবং এস আলম গ্রুপের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে ব্যাপক সমালোচিত হয়েছেন। ২০১৩ সালে খাদ্য অধিদপ্তরের পরিদর্শক নিয়োগে জালিয়াতি এবং দুদকের কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত হয়।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন মো: সাহাবুদ্দিন (চুপ্পু)। সাংবিধানিক আইন অনুযায়ী পাঁচ বছরের মেয়াদের হিসাব ধরে ২০২৮ সালের এপ্রিল পর্যন্ত তার এই সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত থাকার কথা ছিল। তবে তার নিয়োগের শুরু থেকেই দেশের রাজনৈতিক ও আইনি অঙ্গনে তীব্র বিতর্ক দেখা দেয়। এই বিতর্কের মূল কারণ ছিল ‘দুদক আইন, ২০০৪’-এর ৯ ধারা, যা অনুযায়ী কমিশনের চেয়ারম্যান বা কমিশনার প্রজাতন্ত্রের কোনো লাভজনক পদে নিয়োগ লাভের জন্য যোগ্য নন। সাহাবুদ্দিন ২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত দুদক কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করার পর রাষ্ট্রপতি হওয়ায় এই আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে।

খাদ্য অধিদপ্তরের নিয়োগ দুর্নীতিতে জালিয়াতির অভিযোগটি ছিল সবচেয়ে গুরুতর। ২০১৩ সালে ৪৪ জন পরিদর্শক নিয়োগের ক্ষেত্রে নম্বরপত্র কারচুপি করে অযোগ্য প্রার্থীদের উত্তীর্ণ দেখানো হয়। ২০১৪ সালের ৭ অক্টোবর দুদক এ ঘটনায় শাহবাগ থানায় একটি মামলা দায়ের করে। তদন্তে জানা যায়, আসল অপরাধীদের আড়াল করতে দুদকের কর্মকর্তাদের প্রায় ৮০ লাখ টাকা ঘুষ দেওয়া হয়েছিল, যার মধ্যে ৩০ লাখ টাকা সাহাবুদ্দিনের হাতে পৌঁছেছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। পাবনা জেলা পরিষদের তৎকালীন চেয়ারম্যান রেজাউল রহিম লালের মধ্যস্থতায় এই ঘুষ লেনদেন হয় বলে তদন্ত নথিতে উল্লেখ আছে। এর বিনিময়ে সাহাবুদ্দিন তদন্ত কর্মকর্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে সুবিধাভোগীদের চাকরি বহাল রাখেন এবং তৎকালীন খাদ্যমন্ত্রীসহ মন্ত্রণালয়ের নীতি নির্ধারকদের অভিযোগপত্র থেকে বাদ দেন। পরবর্তীতে প্রভাবশালীদের বাদ দিয়ে দায়সারা চার্জশিট দাখিল করা হয়।

দুদক কমিশনার থাকাকালে সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে পদোন্নতি বাণিজ্যেরও অভিযোগ ওঠে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠতা ও মেধার পরিবর্তে অর্থ দাবি করা হতো। পদোন্নতির তালিকায় শীর্ষে থাকা এক কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, তার কাছে প্রথমে ১০ লাখ এবং পরে তিন লাখ টাকা দাবি করা হলেও তিনি তা দিতে অস্বীকৃতি জানানোর ফলে তার পদোন্নতি আটকে দেওয়া হয়।

পদ্মা সেতু প্রকল্পের পরামর্শক নিয়োগে দুর্নীতির ষড়যন্ত্র সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক কেলেঙ্কারির তদন্তেও সাহাবুদ্দিনের ভূমিকা বিতর্কিত ছিল। ২০১২ সালে দুদক মামলা দায়ের করলেও ২০১৪ সালে বিশ্বব্যাংকের চাপের মুখে মামলাটি চূড়ান্তভাবে সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়। সমালোচকদের মতে, স্বাধীন তদন্ত না করে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষায় তড়িঘড়ি করে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ক্লিনচিট দেওয়া হয়েছিল।

বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারির ঘটনায় ২০১৫ সালে দুদক ৫৬টি মামলা করলেও ব্যাংকটির মূল কারিগর ও তৎকালীন চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চু এবং পরিচালনা পর্ষদের কাউকে আসামি করা হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, সাহাবুদ্দিনের হস্তক্ষেপে বাচ্চু ও তার সহযোগীদের রক্ষা করা হয়। প্রায় আট বছর পর ২০২৩ সালে চার্জশিট দাখিলকালে তদন্ত কর্মকর্তারা আদালতে স্বীকার করেন যে, তৎকালীন কমিশনারদের রাজনৈতিক চাপ ও বাধার কারণে মূল আসামিদের আগে চার্জশিটভুক্ত করা সম্ভব হয়নি।

দুদকের দায়িত্ব শেষ করার পর মো. সাহাবুদ্দিন ‘এস আলম গ্রুপ’ নিয়ন্ত্রিত ইসলামী ব্যাংক ও এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের সঙ্গে যুক্ত হন। ২০১৭ সালে ইসলামী ব্যাংকের স্বতন্ত্র পরিচালক ও ভাইস চেয়ারম্যান এবং এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের উপদেষ্টা হিসেবে তিনি আর্থিক সুবিধা নিয়েছেন। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিনি এই পদগুলোতে বহাল ছিলেন। তার মেয়াদকালেই ইসলামী ব্যাংকের সুশাসন ধসে পড়ে এবং ভুয়া প্রতিষ্ঠানকে শত শত কোটি টাকা ঋণ বিতরণের অভিযোগ ওঠে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো তাকে ‘এস আলম গ্রুপের প্রতিনিধি’ হিসেবেও আখ্যায়িত করেছিল।

রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর মো. সাহাবুদ্দিনের ভূমিকা আরও বেশি সমালোচিত হয়। ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির একতরফা জাতীয় নির্বাচনকে তিনি কোনো উদ্যোগ ছাড়াই সাংবিধানিক অনুমোদন দেন। জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব গণ-অভ্যুত্থানের সময় শিক্ষার্থীদের ওপর নির্বিচারে গুলি, গণগ্রেফতার ও শত শত মানুষকে হত্যার ঘটনায় তিনি সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। আন্দোলনকারীদের স্মারকলিপি নিয়েও তিনি কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেননি।

শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছাড়ার পর, রাষ্ট্রপতির উপস্থিতিতেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। ওই দিন রাতে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন শেখ হাসিনার পদত্যাগের কথা নিশ্চিত করলেও পরবর্তীতে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, শেখ হাসিনার কোনো লিখিত পদত্যাগপত্র তার কাছে নেই। তার এই পরস্পরবিরোধী বক্তব্যে দেশে সাংবিধানিক বিভ্রান্তি ও সরকার পতনের বৈধতা নিয়ে নতুন আইনি বিতর্কের জন্ম হয়।

এছাড়াও, মালয়েশিয়ার ‘মাই সেকেন্ড হোম’ কর্মসূচির আওতায় বিনিয়োগ এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও ব্যবসায়িক অংশীদারিত্বের প্রমাণ মিলেছে। তার কাছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের রেসিডেন্সি ভিসা ও বিকল্প পাসপোর্ট থাকার তথ্যও প্রকাশ পায়, যা বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান হওয়ার সাংবিধানিক যোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

মো. সাহাবুদ্দিনের বিচার বিভাগ, দুদক, ব্যাংক খাত এবং সবশেষে রাষ্ট্রপতির পদ—প্রতিটি ধাপে আইনি শিথিলতা, দুর্নীতির প্রশ্রয় ও দলীয় আনুগত্যের অভিযোগ তার বিরুদ্ধে উঠেছে। এই সব অভিযোগ তাকে দেশের ইতিহাসে অন্যতম বিতর্কিত ব্যক্তিতে পরিণত করেছে।

রাষ্ট্রপতি পদ থেকে মো. সাহাবুদ্দিন সরে দাঁড়ানোর পর তাকে গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় আনার দাবি তুলেছে কয়েকটি রাজনৈতিক দল। তবে সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন বা দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে করা কোনো কাজের জন্য তাকে জবাবদিহি করতে হবে না এবং গ্রেফতার বা কারাবাসের জন্য পরোয়ানা জারি করা যাবে না। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হাবিবুর রহমান ব্যাখ্যা করেছেন যে, রাষ্ট্রপতি পদের দায়িত্বের অংশ নয় এমন কোনো কাজ বা রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগের ফৌজদারি অপরাধ এই দায়মুক্তির আওতায় পড়বে না। তবে রাষ্ট্রপতি হিসেবে ভূমিকার জন্য তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না বলে তিনি মনে করেন।

শেয়ার করুন