বিতর্ক ও বিস্ময় নিয়ে বিদায় নিলেন রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন

প্রকাশ:

তিন বছর তিন মাস দায়িত্ব পালনের পর রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করেছেন। তাঁর রাষ্ট্রপতি হওয়ার সিদ্ধান্তটি যেমন বিস্ময়কর ছিল, তেমনি মেয়াদকালে নানা বিতর্কও তাঁকে ঘিরে ছিল।

মো. সাহাবুদ্দিনকে রাষ্ট্রপতি পদে আওয়ামী লীগের প্রার্থী করার খবরটি ২০২৩ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি প্রকাশ্যে এলে দলটির অনেক জ্যেষ্ঠ নেতাও বিস্মিত হয়েছিলেন। সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি হিসেবে তখন অনেকের নাম আলোচনায় থাকলেও সাহাবুদ্দিনের নাম কারও ভাবনায় ছিল না। আওয়ামী লীগের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতার সংসদে অন্য কোনো প্রার্থী না থাকায় তিনি পরদিনই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। তিনি তখন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ছিলেন এবং এর কয়েক মাস আগে ২০২২ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত দলের জাতীয় সম্মেলনে নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্বও পালন করেন। তবে দলের জ্যেষ্ঠ ও অধিক পরিচিত নেতাদের বাদ দিয়ে তাঁকে কেন রাষ্ট্রপতি করা হলো, তার কোনো পরিষ্কার ব্যাখ্যা তখন দেওয়া হয়নি।

বিচারক থাকাকালে মো. সাহাবুদ্দিন খুব একটা সুনামধারী ছিলেন না বলে জানা গেছে। পরে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশনার হওয়ার পর তিনি আরও দুর্নাম কুড়ান। দুদকের কমিশনার থাকার সময় বেসিক ব্যাংকের আলোচিত ঋণ কেলেঙ্কারির তদন্ত নিয়েও সংস্থাটি প্রশ্নের মুখে পড়েছিল। ২০১৫ সালে প্রায় ২ হাজার ৩৭ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ৫৬টি মামলা হলেও ব্যাংকটির তৎকালীন চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চু ও পরিচালনা পর্ষদের কাউকে আসামি করা হয়নি। অথচ ব্যাংকটির ঋণ অনুমোদনের চূড়ান্ত ক্ষমতা ছিল পর্ষদের হাতে। আট বছর পর ২০২৩ সালে দুদক ৫৯ মামলার মধ্যে ৫৮টির অভিযোগপত্রে বাচ্চুকে আসামি করে। পরবর্তী সময়ে তদন্ত কর্মকর্তারা আদালতকে জানান, তৎকালীন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের চাপের কারণে পরিচালকদের আসামি করা যায়নি।

সাহাবুদ্দিন দুদকের কমিশনার থাকার সময় পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ নিয়ে দুদকের তদন্তেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ২০১২ সালে পদ্মা সেতু প্রকল্পের পরামর্শক নিয়োগে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগে সাতজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছিল দুদক। কিন্তু ২০১৪ সালে চূড়ান্ত প্রতিবেদনের মাধ্যমে মামলাটি শেষ করে দেওয়া হয়। তখনকার দুদক কর্মকর্তারা বলেছিলেন, অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সাহাবুদ্দিনও পরে বিভিন্ন সময় দাবি করেন, বিশ্বব্যাংকের চাপে মামলাটি করা হয়েছিল এবং তদন্তে দুর্নীতির প্রমাণ মেলেনি। গণ–অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দুদক মামলাটি আবার অনুসন্ধান শুরু করে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে দুদকের তৎকালীন চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মোমেন বলেন, পদ্মা সেতুর পরামর্শক নিয়োগে অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে। তাঁর অভিযোগ ছিল, তৎকালীন দুদক চেয়ারম্যান এম বদিউজ্জামান ও কমিশনার মো. সাহাবুদ্দিন তদন্তটি ধামাচাপা দিয়েছিলেন। তবে এ অভিযোগ এখনো বিচারিকভাবে প্রমাণিত নয়।

দুদকের দায়িত্ব ছাড়ার পর সাহাবুদ্দিন বিতর্কিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এস আলমের নিয়ন্ত্রণে থাকা দুটি ব্যাংকের সঙ্গে যুক্ত হন। তিনি ২০১৭ সালে এস আলম গ্রুপ ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর ব্যাংকটির স্বতন্ত্র পরিচালক ও ভাইস চেয়ারম্যান হন। একই গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে থাকা এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের উপদেষ্টার দায়িত্বও পালন করেন। রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন পাওয়ার পর ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ থেকে পদত্যাগ করেন। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ইসলামী ব্যাংকে এস আলম গ্রুপের প্রভাব ও বিপুল অর্থ বের করে নেওয়ার তথ্য প্রকাশ্যে আসে। এস আলমের নিয়ন্ত্রণাধীন সময়ে সাহাবুদ্দিন ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদে থাকায় তাঁর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন পাওয়ার পর সমালোচকেরা তাঁকে ‘এস আলমের প্রতিনিধি’ হিসেবেও আখ্যায়িত করেছিলেন।

রাষ্ট্রপতি পদে তাঁর আইনগত যোগ্যতা নিয়েও আদালত পর্যন্ত বিতর্ক গড়ায়। দুদক আইনের ৯ ধারায় বলা আছে, কমিশনের চেয়ারম্যান বা কমিশনার দায়িত্ব শেষ হওয়ার পর প্রজাতন্ত্রের কর্মে কোনো লাভজনক পদে নিয়োগের যোগ্য হবেন না। এই বিধানের কারণে দুদকের সাবেক কমিশনার সাহাবুদ্দিন রাষ্ট্রপতি হতে পারেন কি না, তা নিয়ে বিতর্ক ওঠে। তাঁকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশনের প্রজ্ঞাপনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে দুটি রিটও করা হয়। হাইকোর্ট রিট দুটি খারিজ করে বলেন, রাষ্ট্রপতির পদ প্রজাতন্ত্রের কর্মে লাভজনক পদ নয় এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন, অন্য সরকারি কর্মচারীদের মতো নিয়োগ পান না। আপিল বিভাগও হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন।

মো. সাহাবুদ্দিনের রাষ্ট্রপতি মেয়াদের বড় রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয় শেখ হাসিনার পদত্যাগ নিয়ে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন বলেছিলেন, শেখ হাসিনা তাঁর কাছে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগপত্র দিয়েছেন এবং তিনি তা গ্রহণ করেছেন। কিন্তু ওই বছরের অক্টোবরে দৈনিক মানবজমিন–এর প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরীর সঙ্গে আলাপকালে মো. সাহাবুদ্দিন বলেন, শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন বলে তিনি শুনেছেন; কিন্তু তাঁর কাছে এর কোনো দালিলিক প্রমাণ নেই। এ বক্তব্য তাঁর ৫ আগস্টের ভাষণের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল। তৎকালীন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল একে ‘মিথ্যাচার’ ও রাষ্ট্রপতির শপথ লঙ্ঘনের শামিল বলে মন্তব্য করেন।

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর রাষ্ট্রপতি হিসেবে সাহাবুদ্দিনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ ছিল, শেখ হাসিনা সরকারের দমন–পীড়ন ও হত্যাকাণ্ড চলার সময় রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তিনি কার্যকর কোনো ভূমিকা নেননি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ গঠনের পর বিরোধী দলগুলোর পক্ষ থেকেও একই অভিযোগ সামনে আসে। সংসদের প্রথম অধিবেশনে তাঁর ভাষণের সময় বিরোধীদলীয় সদস্যরা প্রতিবাদ ও ওয়াকআউট করেন। এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম তাঁকে অভিশংসনের মাধ্যমে অপসারণ ও গ্রেপ্তারের দাবি জানান। নাহিদের অভিযোগ ছিল, সাহাবুদ্দিন শপথ ভঙ্গ করেছেন, তাঁর বিরুদ্ধে আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে এবং জুলাই আন্দোলনের সময় তিনি নির্বিকার ছিলেন।

এসব বিতর্কের মধ্যেই তিন বছর তিন মাস রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনের পর মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করলেন।

সাহাবুদ্দিন।.অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ সাহাবুদ্দিন ২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত দুদকের কমিশনার ছিলেন।

শেয়ার করুন