জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে শক্তিশালী ও স্বায়ত্তশাসিত করার আহ্বান

প্রকাশ:

জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে একটি স্বাধীন ও সক্ষম সংবিধিবদ্ধ সংস্থা হিসেবে গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়েছেন তুহিন ওয়াদুদ। তিনি মনে করেন, কমিশনকে শক্তিশালী করা হলে তা নদী উদ্ধার এবং অপরাধীদের শাস্তি প্রদানে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে। এর ফলে অবৈধ দূষণকারী, দখলকারী এবং এ কাজে সহায়তাকারী কর্মকর্তারাও কমিশনকে গুরুত্ব দিতে বাধ্য হবেন।

বর্তমানে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন ২০১৩-এর সীমাবদ্ধতার কারণে কমিশন নদী সুরক্ষায় তেমন কোনো কাজ করতে পারছে না। এই প্রেক্ষাপটে উচ্চ আদালতও কমিশনকে শক্তিশালী করার নির্দেশনা দিয়েছেন। আইন সংশোধনের জন্য নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন ২০২৬ (খসড়া) প্রস্তুত করেছে।

বাংলাদেশের ভূমি আইনগুলো যথাযথভাবে পালিত হলে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের প্রয়োজন হতো না। রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৫০ অনুযায়ী ডেপুটি কালেক্টররা নদী রক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত হলেও, বহুবিধ কাজের চাপে তারা নদীর প্রতি যত্নশীল হওয়ার সময় পান না। অনেক ক্ষেত্রে তাদের হাত ধরেই নদীগুলোর ক্ষতি হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে ২০১৩ সালে উচ্চ আদালতের একটি রিট পিটিশনের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন প্রতিষ্ঠা করা হয়।

উচ্চ আদালতের নির্দেশনা সত্ত্বেও ২০১৩ সালের আইনে কমিশনকে প্রায় ক্ষমতাহীন অবস্থায় তৈরি করা হয়েছে। আইন প্রয়োগের কোনো ক্ষমতা কমিশনের নেই। আইনের ১২ ধারায় মাত্র ১৩টি বিষয়ে সুপারিশ করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, যা অনেক ক্ষেত্রে আমলে নেওয়া হয় না। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের ২০১৮ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনেও আইনের সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে যে, নদীর জমি অবৈধ দখল, পুনর্দখল, পানি ও পরিবেশ দূষণ বন্ধ করার কোনো দায়িত্ব কমিশনকে দেওয়া হয়নি। কমিশন একাধিকবার চিঠি দিয়েও জেলা-উপজেলা প্রশাসনের কাছ থেকে কোনো সাড়া পায়নি। তদন্ত প্রতিবেদনসহ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দিলেও কাজ হয়নি, এমনকি জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা পাঠিয়েও নির্দেশনা বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা যায়নি।

কমিশনের আইনি সীমাবদ্ধতার কারণে উচ্চ আদালত ১৩৯৮৯/২০১৯ নং রিট পিটিশনের রায়ে নদীকে ‘আইনগত সত্তা’ ঘোষণা করে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে নদীর আইনি অভিভাবক ঘোষণা করেছেন। তবে মন্ত্রণালয়ের অধীনে থেকে কমিশন স্বাধীনভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছে না। বর্তমানে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা কমিশন, এই রায়ের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাই কমিশনের আর্থিক, প্রশাসনিক ও সার্বিক স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা জরুরি। আইনি অভিভাবকত্ব মানে অন্য দপ্তরের ওপর নির্ভর করা নয়।

উচ্চ আদালত বাংলাদেশের নদীগুলোকে ‘জীবন্ত সত্তা’ ঘোষণা করে রায় দেওয়ার পর জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেয়। ২০২১ সালের জানুয়ারিতে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন ২০২০ (খসড়া) মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হয়েছিল, কিন্তু কেন তা আইনে পরিণত হয়নি, তা জানা যায়নি। এখন নতুন করে আরেকটি খসড়া আইন প্রস্তুত করা হচ্ছে।

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে দেওয়া জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন ২০২৬ (খসড়া) আইনটি চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এই খসড়া আইনে কিছু সীমাবদ্ধতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। যদিও ২০২৩ সালে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন একটি সংজ্ঞা চূড়ান্ত করেছে, যা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। খসড়া আইনে এই সংজ্ঞার মূলভাব ঠিক রেখে কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। সংজ্ঞা অনুযায়ী, পাহাড়, পর্বত, হিমবাহ, হ্রদ, ঝরনা, ছড়া বা অন্য কোনো জলাধার থেকে প্রাকৃতিকভাবে উৎপন্ন হয়ে সারা বছর বা বছরের কোনো সময় দুই তীরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে সমুদ্র, মহাসমুদ্র, হ্রদ, অন্য কোনো জলাধার বা জলধারায় পতিত হওয়া জলধারাকে নদী বোঝাবে। তবে একটি বিল থেকে অন্য বিলে প্রবাহিত প্রবাহকেও নদী হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, যা বিতর্কিত। এছাড়াও, সিএস, এসএ এবং বিএস রেকর্ডে নদী হিসেবে উল্লিখিত অংশগুলোও নদীর অন্তর্ভুক্ত থাকবে—এই অংশটি খসড়া আইনে নেই।

খসড়া আইনে ‘খাল’ সম্পর্কে অস্পষ্ট ধারণা দেওয়া হয়েছে। ৩ ধারার (ব) অংশে বলা হয়েছে, ‘খাল বলিতে পানির অন্তঃপ্রবাহ বা বহিঃপ্রবাহের পথকে বুঝাইবে।’ এই সংজ্ঞা দিয়ে খাল চিহ্নিত করা কঠিন। ২০১৩ সালের আইনে নদী, খাল, বিল, জলাশয় সবই অন্তর্ভুক্ত ছিল, কিন্তু খসড়া আইন ২০২৬-এ জলাশয়কে বাদ দেওয়া হয়েছে। দেশের অনেক নদী নিম্নাঞ্চল বা জলাশয় থেকে উৎপন্ন হয়। স্থানীয় প্রশাসন কর্তৃক জলাশয় লিজ দেওয়া হলে এবং লিজগ্রহীতারা নদীর সঙ্গে বিল বিচ্ছিন্ন করে মাছ চাষ করলে কমিশন আইনগতভাবে কিছু করতে পারবে না, যা কমিশনের জন্য বড় সীমাবদ্ধতা তৈরি করবে। ব্রিটিশ আমলে নদীর গভীর অংশগুলো বিল, দহ বা কুড়া নামে রেকর্ড করা হয়েছিল। খসড়া আইনে জলাশয় অন্তর্ভুক্ত না থাকলে নদীর মধ্যবর্তী বিলগুলো কেউ দখল করলে বা নিজের নামে লিখে নিলে কমিশনের আইনগতভাবে বলার কিছু থাকবে না।

অবৈধ দখলদারের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হলেও, যে সরকারি কর্মকর্তা এসব জমি ব্যক্তির নামে লিখে দেন, তাদের শাস্তির বিধান স্পষ্ট নয়। সাধারণ অপরাধীর শাস্তির বিধান থাকলেও, সরকারি কর্মকর্তার ক্ষেত্রে বিভাগীয় মামলার বিষয়টি উল্লেখ থাকা প্রয়োজন। উদাহরণস্বরূপ, একজন কর্মকর্তা ১০০ কোটি টাকা মূল্যের সরকারি জমি কাউকে লিখে দিলে তার শাস্তি স্পষ্ট নয়। যার নামে জমি লেখা হবে, তার সর্বোচ্চ শাস্তি পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা বা ১৫ বছরের জেল হতে পারে। দখলভেদে শাস্তি আরও বাড়ানো প্রয়োজন। নদী দখল ও জমি লিখে দেওয়ার সঙ্গে জড়িত সবাইকে শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

অনেক সরকারি সংস্থা ও বিভাগ নদীর ক্ষতি করছে, কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে আইনে কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি। পানি উন্নয়ন বোর্ড করতোয়া, বড়াল, ইছামতী নদী এবং তিস্তার অন্তত ১০টি শাখা নদী মেরে ফেলেছে। পাউবোসহ বরেন্দ্র, বিএডিসি, এলজিইডি, মৎস্য বিভাগ খননের নামে নদীকে সংকুচিত করেছে। এলজিইডি অনেক স্থানে সেতু ছাড়া নদীর ওপর আড়াআড়ি রাস্তা নির্মাণ করে নদীর চরম সর্বনাশ করছে। এসব সংস্থা আইনের ঊর্ধ্বে থাকবে কিনা, তা প্রস্তাবিত খসড়া আইনে স্পষ্ট থাকা উচিত।

জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন ২০২০ (খসড়া) এ বিভাগীয় পর্যায়ে কার্যালয় ও আদালত প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছিল। নতুন খসড়া আইনে কমিশন চাইলে জেলা পর্যায়ে আদালত প্রতিষ্ঠা করতে পারবে বলা হয়েছে। তবে ৪ ধারায় প্রয়োজনে বিভাগীয় বা জেলা কার্যালয় প্রতিষ্ঠার কথা বলা হলেও, বাস্তবে বিভাগীয় পর্যায়ে কার্যালয় ও আদালত দুটোই খুব প্রয়োজন। আইনে প্রতিষ্ঠার বাধ্যবাধকতা রাখা জরুরি।

খসড়া আইনের ১২ ধারায় কমিশনকে দখল-দূষণমুক্ত করার ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ ও উদ্যোগ গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু কমিশনের ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা না থাকলে নদী দখলমুক্ত করা কঠিন হবে। প্রস্তাবিত খসড়া আইনের ১৩ ধারায় বলা হয়েছে, কমিশন কর্তৃক প্রদত্ত নির্দেশনা ও পরামর্শ নির্দিষ্ট সময়ে বাস্তবায়ন করতে হবে এবং বাস্তবায়ন করতে না পারলে যুক্তিসংগত জবাব দিতে হবে। কিন্তু নির্দেশনা পালন না করলে কী হবে, তা উল্লেখ নেই। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের অসংখ্য নির্দেশনা জেলা প্রশাসক বা ইউএনওরা পালন করেন না। তাই সংশ্লিষ্ট প্রশাসন নির্দেশনা পালন না করলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা আইনে স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন।

তুহিন ওয়াদুদ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক এবং নদী রক্ষাবিষয়ক সংগঠন রিভারাইন পিপলের পরিচালক, মনে করেন, যাদের নদী সুরক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তাদের অনেকেই নদীর প্রকৃত সংকট বোঝেন না। ১৬ বছর ধরে নদী সুরক্ষায় মাঠপর্যায়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলেন, কমিশনকে স্বাধীন ও সক্ষম সংবিধিবদ্ধ সংস্থা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে তা নদী উদ্ধার ও অপরাধীদের শাস্তি দিতে পারে। আইন বারবার সংশোধন করা কঠিন, তাই এবার এমন আইন করতে হবে যা নদী সুরক্ষা নিশ্চিত করবে।

নদীগুলো রক্ষার্থে তাই ২০১৩ সালে উচ্চ আদালতের ৩৫০৩/২০০৯ নং রিট পিটিশনের রায়ে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন প্রতিষ্ঠা করা হয়।.২০১৩ সালের আইনে কমিশনের সীমাবদ্ধতাউচ্চ আদালতের নির্দেশে কমিশন গঠন করা হলেও সেই কমিশনকে প্রায় ক্ষমতাহীনভাবে তৈরি করা হয়েছে।

খসড়া আইনে এই অংশটুকু নেই।.তালিকায় ১ হাজার ৪১৫ নদী, এবার কি বাঁচবে.খাল সম্পর্কে অস্পষ্টতাখসড়া আইনে খাল সম্পর্কে খুবই অস্পষ্ট ধারণা দেওয়া হয়েছে।

শেয়ার করুন