মুসলিম বিশ্বের সাহসী চিন্তাবিদ মাওলানা সালমান নদভীর প্রয়াণ

প্রকাশ:

ইসলামী জ্ঞানচর্চার আকাশে বিচরণকারী এক উজ্জ্বল নক্ষত্র মাওলানা সাইয়েদ সালমান হোসাইনি নদভী (১৯৫৪-২০২৬) গত ২৯ জুন আমাদের ছেড়ে চিরবিদায় নিয়েছেন। তার প্রস্থান মুসলিম বিশ্বের একজন সাহসী চিন্তাবিদ ও দক্ষ সংগঠককে হারানোর বেদনার পাশাপাশি এক গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক শূন্যতা তৈরি করেছে। উপমহাদেশের ইসলামী জ্ঞানসাধনায় নদওয়াতুল উলামার বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্য এবং আধুনিক বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের এক অনন্য সংমিশ্রণ ছিলেন তিনি।

১৯৫৪ সালে লখনৌয়ের এক ঐতিহ্যবাহী আলেম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন মাওলানা সালমান নদভী। তিনি বিখ্যাত মুফাক্কিরে ইসলাম মাওলানা সাইয়েদ আবুল হাসান আলী হাসানি নদভী রহ. এবং নদওয়াতুল উলামার প্রাক্তন নাজিম ডাক্তার সাইয়েদ আবদুল আলী হাসানির দৌহিত্র ছিলেন। লখনৌয়ের দারুল উলুম নদওয়াতুল উলামা থেকে হাফেজে কুরআন হওয়ার মধ্য দিয়ে তার শিক্ষাজীবনের যাত্রা শুরু হয়। ১৯৭৪ সালে তিনি স্নাতক এবং ১৯৭৬ সালে হাদিস শাস্ত্রে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে সৌদি আরবের ইমাম মুহাম্মদ ইবনে সাউদ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারি বৃত্তি নিয়ে হাদিস গবেষক শেখ আবদুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহর তত্ত্বাবধানে পুনরায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তার গবেষণামূলক প্রবন্ধ ‘জামউ আলফাজিল-জারহ ওয়াত-তাদিল’ আলেম মহলে ব্যাপক সমাদৃত হয়েছিল।

তিনি সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভীর ফিকরি মিশনের প্রধান সেনাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং ‘রিজালুল ফিকরি ওয়াদ দাওয়াহ’ ও ‘ফি মাসিরাতিল হায়াত’-এর মতো বিখ্যাত গ্রন্থের সম্পাদনায় বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন। কর্মজীবনে তিনি ‘জামিয়াত শাবাব আল-ইসলাম’ প্রতিষ্ঠা করেন, যা বর্তমানে প্রভাবশালী যুব সংগঠনে রূপ নিয়েছে। এছাড়া ড. আব্দুল আলী ইউনানি মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের চেয়ারম্যান এবং দারুল উলুম সৈয়দ আহমদ শহীদ-এর প্রতিষ্ঠাতা চ্যান্সেলর হিসেবে তিনি শিক্ষা ও সমাজসেবায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তার রচিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘আখেরি ওহি’, ১৫ খণ্ডের ‘মিশআলুল মাসাবিহ’, ‘মাশায়েখুল ইমাম বুখারি’ এবং ২৪ খণ্ডের আত্মস্মৃতিমূলক ‘মুযাক্কিরাতি’।”

মাওলানা সালমান নদভী আরবি ও উর্দু ভাষায় অত্যন্ত দক্ষ বক্তা ছিলেন এবং সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সবসময় আপসহীন কণ্ঠস্বর হিসেবে পরিচিত ছিলেন। আল্লামা সুলতান যওক নদভী ও মাওলানা আবদুল হাই নদভীর আমন্ত্রণে তিনি বেশ কয়েকবার বাংলাদেশ সফর করেছেন। আধুনিক শিক্ষার সাথে ইসলামী নৈতিকতার সমন্বয়ে নতুন প্রজন্মকে গড়ে তোলার ওপর তিনি সবসময় গুরুত্ব দিতেন।

তার জীবনের শেষভাগে কিছু রাজনৈতিক ও আদর্শিক অবস্থান নিয়ে আলেমসমাজের একাংশের সাথে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে সাহাবায়ে কেরামের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং বাবরি মসজিদ ইস্যুতে তার বিতর্কিত অবস্থান তাকে মূলধারা থেকে কিছুটা দূরে সরিয়ে দিয়েছিল। তবে জীবনের শেষ পর্যায়ে তিনি আত্মঅহমিকা ত্যাগ করে প্রকাশ্যে নিজের ভুল স্বীকার করেন এবং আল্লাহর কাছে তাওবা করেন। তিনি ঘোষণা করেছিলেন, তার কোনো বক্তব্য কুরআন ও হাদিসের পরিপন্থী হলে তা যেন গ্রহণ করা না হয়। সত্যের সামনে মাথা নত করার এই দৃষ্টান্ত তার জীবনের ইতিবাচক দিক হিসেবেই বিবেচিত হবে। তার রেখে যাওয়া ইলমি সম্পদ এবং সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন মুসলিম উম্মাহর জন্য পাথেয় হয়ে থাকবে।

শেয়ার করুন