ইরান-ইসরাইল সঙ্ঘাত ও নতুন বিশ্বব্যবস্থার সমীকরণ

প্রকাশ:

বিশ্বরাজনীতির ইতিহাসে কিছু সঙ্ঘাত কেবল সীমান্ত পরিবর্তনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা ইতিহাসের গতিপথকেও আমূল বদলে দেয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের অবসান ঘটিয়েছিল এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ জন্ম দিয়েছিল দ্বিমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বের। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে যে একমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল, আজকের ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল সঙ্ঘাত তার স্থায়িত্ব নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি করেছে। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে ইরান ও ইসরাইলের সরাসরি সামরিক সংঘর্ষ এবং এতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে। দীর্ঘদিনের প্রক্সি যুদ্ধের পরিবর্তে এই খোলাখুলি সংঘাত প্রমাণ করেছে যে, মধ্যপ্রাচ্য এখন আর কেবল একটি আঞ্চলিক সঙ্কটের কেন্দ্র নয়, বরং এটি ভবিষ্যৎ বিশ্বব্যবস্থার এক পরীক্ষাগার।

এই পরিস্থিতি বিশ্লেষণের জন্য দুই বিপরীতমুখী চিন্তাবিদ আলেক্সান্ডার ডুগিন এবং ফ্রান্সিস ফুকুয়ামার দৃষ্টিভঙ্গি গুরুত্বপূর্ণ। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল সঙ্ঘাতকে ডুগিন দেখেন পশ্চিমা এক মেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার বিরুদ্ধে বহু মেরুকেন্দ্রিক বিশ্বের উত্থান হিসেবে; অন্য দিকে মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা এটিকে উদারনৈতিক আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলার ওপর কর্তৃত্ববাদী শক্তির চ্যালেঞ্জ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো- ২০২৬ সালের বাস্তবতা। ডুগিনের মতে, এই সঙ্ঘাত পশ্চিমা আধিপত্যের পতনের ইঙ্গিতবাহী। তিনি মনে করেন, আন্তর্জাতিক রাজনীতির মূল চালিকাশক্তি রাষ্ট্র নয়, বরং সভ্যতা। তার দৃষ্টিতে, স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্র তার একক রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মডেল চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে, যা এখন ইরান, রাশিয়া ও চীনের মতো শক্তির দ্বারা চ্যালেঞ্জের মুখে। ডুগিন ইরানকে এমন এক ইসলামী সভ্যতার প্রতিনিধি হিসেবে দেখেন, যা পশ্চিমা আধিপত্যের বিরুদ্ধে নিজস্ব পরিচয় রক্ষার সংগ্রাম করছে। অন্যদিকে, ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা এটিকে রাজনৈতিক ব্যবস্থার দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখেন। তার মতে, উদারনৈতিক গণতন্ত্র ও আইনের শাসন দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতার ভিত্তি। তবে তিনি গাজা যুদ্ধ ও ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কারণে পশ্চিমা বিশ্বের নৈতিক অবস্থান দুর্বল হওয়ার বিষয়ে সতর্ক করেছেন।

বর্তমান বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্র এখনো বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক শক্তি হিসেবে টিকে থাকলেও, বিশ্ব এখন আর ১৯৯৫ সালের মতো একপাক্ষিক নয়। চীনের অর্থনৈতিক উত্থান, ব্রিকসের সম্প্রসারণ এবং রাশিয়ার বিকল্প অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বের ভিত্তি তৈরি করছে। উপসাগরীয় দেশগুলো এখন ওয়াশিংটন, বেইজিং ও মস্কোর সাথে ভারসাম্য বজায় রেখে কূটনীতি পরিচালনা করছে, যাকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভাষায় স্ট্র্যাটেজিক হেজিং বলা হয়। ন্যাটো জোট ইউক্রেন যুদ্ধের পর সংহত হলেও, বিশ্বে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ যে ঘটছে তা অস্বীকার করার উপায় নেই।

আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা হ্রাস পাওয়ায় নিয়মভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা আজ বড় ধরনের সঙ্কটে। ডুগিন বা ফুকুয়ামা কার ভবিষ্যদ্বাণী সঠিক তা এখনই পুরোপুরি বলা সম্ভব নয়, তবে বিশ্ব এখন এক অন্তর্বর্তীকালীন পর্যায়ে রয়েছে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল ও বাণিজ্যনির্ভর দেশের জন্য এই পরিবর্তিত ভূ-রাজনীতি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। জ্বালানি নিরাপত্তা, শিপিং ব্যয় এবং বৈদেশিক মুদ্রার চাপের পাশাপাশি বাংলাদেশের জন্য পররাষ্ট্রনীতির বড় চ্যালেঞ্জ হবে ভারসাম্য রক্ষা করা। এক্ষেত্রে ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়’ নীতিটি কেবল রাজনৈতিক স্লোগান নয়, বরং বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বের বাস্তব কূটনৈতিক প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শেয়ার করুন