রফতানি খাতে অপ্রচলিত পণ্যের ক্রমবর্ধমান সম্ভাবনা ও অবদান

প্রকাশ:

বাংলাদেশের রফতানি বাণিজ্যে অপ্রচলিত পণ্যের অবদান দিন দিন বাড়ছে। বর্তমানে মোট রফতানির ৮০ শতাংশেরও বেশি আসছে এই খাত থেকে, যা থেকে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়েছে। প্রতিবেশী দেশগুলোর পাশাপাশি ইউরোপ, আমেরিকা ও আফ্রিকার বাজারেও এখন বাংলাদেশের তৈরি বিভিন্ন অপ্রচলিত পণ্য রফতানি হচ্ছে। এই খাতের সম্প্রসারণ শুধু বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেই সহায়তা করছে না, বরং স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক কর্মসংস্থানও সৃষ্টি করছে।

খনার বচনের সেই কৃষিপ্রধান অর্থনীতির উত্তরাধিকার বহনকারী বাংলাদেশ আজ ৫৫ বছর পর খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। ১৯৭১-৭২ সালে সাড়ে সাত কোটি জনসংখ্যার দেশটিতে এখন প্রায় ১৮ কোটি মানুষ। চাষযোগ্য জমি কমে যাওয়া সত্ত্বেও কৃষক ও গ্রামীণ অর্থনীতির নীরব বিপ্লবে বাংলাদেশ চাল, মাছ ও শাকসবজি উৎপাদনে বিশ্বে তৃতীয়, মাছ চাষে পঞ্চম এবং মৌসুমি ফল উৎপাদনে দশম অবস্থানে উঠে এসেছে। গ্রামীণ অর্থনীতিতে এই রূপান্তর সম্ভব হয়েছে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে গৃহীত বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মসূচির ফলে। সংবিধানের ১৬ নং অনুচ্ছেদে বর্ণিত অঙ্গীকার অনুযায়ী, গ্রামাঞ্চলে কুটিরশিল্প ও অন্যান্য শিল্পের বিকাশে রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১৯ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৭৮.৬ শতাংশ মানুষ গ্রামে বসবাস করে। এই গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নে নারীর অংশগ্রহণ একটি বড় নিয়ামক হয়ে উঠেছে। এসএমই ফাউন্ডেশন ও বিআইডিএস-এর গবেষণা অনুযায়ী, ব্যবসায় সম্পৃক্ত শিক্ষিত নারীর হার ২০০৯ সালের ২০ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০১৭ সালে ২৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। মাইক্রোক্রেডিট এবং ফ্যামিলি বা কৃষক কার্ডের মতো উদ্যোগগুলো এই অগ্রগতিকে আরও ত্বরান্বিত করছে। গ্রামীণ অবকাঠামো ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির ফলে গ্রামে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে বিনিয়োগ বাড়ছে। বর্তমানে ৭৮ লাখ ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা দেশের জিডিপিতে ২৫ শতাংশ অবদান রাখছেন, যেখানে সামগ্রিক শিল্প খাতের অবদান ৩৫ শতাংশ।

অপ্রচলিত পণ্যের তালিকায় রয়েছে মৎস্য, হিমায়িত চিংড়ি, শুঁটকি, কাঁকড়া, শাকসবজি, ফলমূল, হস্তশিল্প, টেরিটাওয়েল, পরচুলা, চারকোল, খেলনা, আগর, সিরামিক পণ্য, ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল (এপিআই), এবং তামার তারসহ প্রায় অগণিত পণ্য। বাংলাদেশে প্রায় ৭০ ধরনের প্রচলিত ও অপ্রচলিত ফল জন্মে, যার বৈচিত্র্যময় স্বাদ ও গুণমান বিশ্ববাজারে সমাদৃত। একই সাথে বিউটি পার্লার, মোবাইল ব্যাংকিং, স্বাস্থ্যসেবা ও বিভিন্ন মেরামতমূলক সেবা খাত গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করছে।

বিশ্ব অর্থনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার বাণিজ্য লড়াইয়ের সুফলও বাংলাদেশ পাচ্ছে। চীন থেকে পণ্য আমদানিতে মার্কিন শুল্ক বাড়ায় অনেক ক্রেতা এখন বাংলাদেশের দিকে ঝুঁকছেন। যদিও কিছু পণ্যের বাজার এখনও ছোট, তবুও দিন দিন রফতানি পণ্যের ঝুড়ি বড় হচ্ছে। স্থানীয় প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করে এবং উদ্যোক্তাদের সৃজনশীলতায় এই অপ্রচলিত পণ্যগুলো বাংলাদেশের অর্থনীতির সহনশীলতা বা রেজিলিয়েন্স বাড়িয়ে তুলেছে, যা মহামারী করোনার মতো বিপর্যয় মোকাবিলাতেও সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে।

শেয়ার করুন