প্রতিযোগিতা আইন: বাজার নিয়ন্ত্রণ ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে অপরিহার্য

প্রকাশ:

বাজারের একচেটিয়া আধিপত্য, সিন্ডিকেট বা দাম নিয়ে কারসাজি রোধ করে পণ্য ও সেবার ন্যায্যমূল্য ও সুষ্ঠু প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিতে সহায়তা করে প্রতিযোগিতা আইন। এই আইনের মূল লক্ষ্য হলো, কোনো প্রভাবশালী ব্যবসায়ী যাতে নিজের ক্ষমতা অপব্যবহার করে সাধারণ ক্রেতা বা ছোট ব্যবসায়ীদের ক্ষতিগ্রস্ত করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা। বাংলাদেশে ২০১২ সালে প্রতিযোগিতা আইন-২০১২ প্রণীত হয়। এর আগে ব্যবসায় একচেটিয়া আধিপত্য রোধে মনোপলিস অ্যান্ড রেস্ট্রিকটিভ ট্রেড প্র্যাকটিসেস (কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন) অর্ডিন্যান্স-১৯৭০ কার্যকর ছিল। আশা করা যায়, নতুন আইনটি ফলপ্রসূভাবে কার্যকর করা গেলে বাজারের একচেটিয়া আধিপত্য রোধ করে পণ্য ও সেবার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে সহায়ক হবে।

ব্যবসার ক্ষেত্রে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য বিভিন্ন ব্যবসায়িক সংস্থার মধ্যে যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, সেটিই হলো প্রতিযোগিতা। এই প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশে ২০১২ সালের প্রতিযোগিতা আইনের অধীনে বিচারিক ক্ষমতাসম্পন্ন ‘বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন’ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এই কমিশন ষড়যন্ত্রমূলক যোগসাজশ, মনোপলি ও ওলিগপলি রোধকল্পে কাজ করে।

প্রতিযোগিতা আইন ((Competition Law) হলো এমন একটি আইন, যা বাজারের একচেটিয়া আধিপত্য, সিন্ডিকেট বা দাম নিয়ে কারসাজি রোধ করে পণ্য ও সেবার ন্যায্যমূল্য ও সুষ্ঠু প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিতে সহায়তা করে। এই আইনের অধীনে, ‘ষড়যন্ত্রমূলক যোগসাজশ’ বলতে সুস্থ ও স্বাভাবিক প্রতিযোগিতার পরিবেশ বিনষ্ট করে বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করার অসৎ উদ্দেশ্যে সম্পাদিত লিখিত অথবা অলিখিত চুক্তি বা সমঝোতাকে বোঝায়। ‘মনোপলি’ হলো এমন অবস্থা যেখানে মাত্র একজন ব্যক্তি বা একটি প্রতিষ্ঠান কোনো পণ্য বা সেবার বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। অন্যদিকে, ‘ওলিগপলি’ বলতে কিছু সংখ্যক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কোনো পণ্য বা সেবার বাজার নিয়ন্ত্রণ করে এমন অবস্থানকে বোঝানো হয়েছে।

প্রতিযোগিতা কমিশন একজন চেয়ারপারসন ও অনধিক চারজন সদস্য সমন্বয়ে গঠিত। কমিশনের দায়িত্ব ও ক্ষমতা সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বাজারে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব বিস্তারকারী অনুশীলনগুলো নির্মূল করা, প্রতিযোগিতাকে উৎসাহিত করা ও বজায় রাখা এবং ব্যবসায়-বাণিজ্যের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। কমিশন কোনো অভিযোগের ভিত্তিতে অথবা স্বপ্রণোদিতভাবে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিযোগিতাবিরোধী সব চুক্তি, কর্তৃত্বময় অবস্থান এবং অনুশীলনের তদন্ত করতে পারে।

এছাড়া, কমিশন আইনের অধীন অন্যান্য অপরাধের তদন্ত পরিচালনা এবং তার ভিত্তিতে মামলা দায়ের ও পরিচালনা করে। জোটবদ্ধতা এবং জোটবদ্ধতাসংশ্লিষ্ট বিষয়াদি, যেমন তদন্ত সম্পাদন, শর্তাদি নির্ধারণ এবং অনুমোদন বা নামঞ্জুরসংক্রান্ত বিষয়াদিও কমিশনের আওতাধীন। প্রতিযোগিতা-সংক্রান্ত বিধিমালা, নীতিমালা, দিকনির্দেশনামূলক পরিপত্র বা প্রশাসনিক নির্দেশনা প্রণয়ন এবং তা বাস্তবায়নে সরকারকে পরামর্শ ও সহযোগিতা প্রদানও কমিশনের অন্যতম দায়িত্ব।

প্রতিযোগিতামূলক কর্মকাণ্ডের উন্নয়ন এবং প্রতিযোগিতা-সংক্রান্ত বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদানের জন্য উপযুক্ত মানদণ্ড নির্ধারণ, সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর লোকজনের মধ্যে প্রতিযোগিতা সম্পর্কিত সার্বিক বিষয়ে প্রচার ও প্রকাশনার মাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং গবেষণার মাধ্যমে গণসচেতনতা বৃদ্ধি করে গবেষণালব্ধ ফলাফল প্রকাশ ও প্রচার করা এবং এর কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য সরকারের কাছে সুপারিশ করাও কমিশনের কাজের অংশ। সরকার কর্তৃক প্রেরিত প্রতিযোগিতাসংক্রান্ত যেকোনো বিষয় প্রতিপালন, অনুসরণ বা বিবেচনা করা, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ ও বাস্তবায়নের বিষয়ে অন্য কোনো আইনের অধীন গৃহীত ব্যবস্থাদি পর্যালোচনা করা এবং প্রয়োজনে সরকারের পূর্বানুমোদনক্রমে বিদেশী কোনো সংস্থার সাথে চুক্তি বা সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর ও সম্পাদন করার ক্ষমতাও কমিশনের রয়েছে। আইনের উদ্দেশ্য পূরণের জন্য ফিস, চার্জ বা অন্য কোনো খরচ ধার্য করা এবং বিধি দ্বারা নির্ধারিত অন্য যেকোনো কার্য করার এখতিয়ারও কমিশনের আছে।

কমিশন স্বপ্রণোদিত হয়ে অথবা কোনো অভিযোগের ভিত্তিতে আইনের অধীন উত্থাপিত অভিযোগ সম্পর্কে অনুসন্ধান করতে পারে। দেওয়ানি কার্যবিধি-১৯০৮-এর অধীন একটি দেওয়ানি আদালত যে ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে, যেমন— কোনো ব্যক্তিকে কমিশনে হাজির করার জন্য নোটিশ জারি করা, কোনো দলিল উদঘাটন করা, কোনো তথ্য যাচাই করা, কোনো অফিস থেকে প্রয়োজনীয় কাগজাদি তলব করা, সাক্ষীর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নোটিশ জারি করা— প্রভৃতি বিষয়ে কমিশন অনুরূপ ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবে।

যদি কোনো ব্যক্তি যুক্তিসঙ্গত কারণ ব্যতীত কমিশনের কোনো আদেশ বা নির্দেশনা, আরোপিত কোনো শর্ত বা বিধিনিষেধ বা প্রদত্ত কোনো অনুমোদন লঙ্ঘন করে, তবে তা এই আইনের অধীন একটি অপরাধ বলে গণ্য হবে। এই অপরাধের জন্য তিনি অনধিক এক বছর কারাদণ্ডে বা প্রতিদিনের ব্যর্থতার জন্য অনধিক এক লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। কমিশন বা কমিশনের কাছ থেকে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোনো কর্মকর্তার লিখিত অভিযোগ ব্যতীত কোনো আদালত এই আইনের অধীন কোনো মামলা বিচারার্থে গ্রহণ করবে না এবং এই আইনের অধীন অপরাধ প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক বিচার্য হবে।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন নামে প্রতিযোগিতা আইন কার্যকর রয়েছে। যেমন— ভারতে প্রতিযোগিতাবিরোধী চুক্তি ও জোট নিয়ন্ত্রণ করতে ‘কম্পিটিশন কমিশন অব ইন্ডিয়া-সিসিআই’ কাজ করে, যা দেশটির প্রতিযোগিতা আইন-২০০২ দ্বারা পরিচালিত। পাকিস্তানে ‘পাকিস্তান প্রতিযোগিতা কমিশন-সিপিপি’ বর্তমানে পাকিস্তান প্রতিযোগিতা আইন-২০১০ নামে পরিচিত এবং এটি অবাধ প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে, অর্থনৈতিক দক্ষতা বাড়াতে ও ভোক্তাদের রক্ষা করতে কাজ করে।

চীনে বড় প্রযুক্তি ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর ওপর কঠোর নজরদারি এবং একচেটিয়া বাণিজ্য রোধে ‘স্টেট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ফর মার্কেট রেগুলেশন-এসএএমআর’ কাজ করে। জাপানে প্রতিযোগিতা আইনটি ‘দ্য অ্যাক্ট অন প্রোহিভিশন অব প্রাইভেট মনোপলি অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স অব ফেয়ার ট্রেড-অ্যান্টি-মনোপলি অ্যাক্ট’ নামে পরিচিত এবং দেশটির ‘ফেয়ার ট্রেড কমিশন’ বেআইনি মূল্য নির্ধারণ ও বাজারের ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে জরিমানা ও কারাদণ্ড দিয়ে থাকে।

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিযোগিতা আইনটির নাম ‘মনোপলি রেগুলেশন অ্যান্ড ফেয়ার ট্রেড অ্যাক্ট-এমআরএফটিএ’, যার নিয়ন্ত্রক সংস্থা কোরিয়া ফেয়ার ট্রেড কমিশন-কেএফটিসি বাজার সিন্ডিকেট দমনে কাজ করে। সিঙ্গাপুরে ‘দ্য কম্পিটিশন অ্যাক্ট’ নামে প্রতিযোগিতা আইন রয়েছে, যা প্রতিযোগিতাবিরোধী চুক্তি, একচেটিয়া আধিপত্য এবং ক্ষতিকারক একত্রীকরণ বা অধিগ্রহণ প্রতিরোধে ‘কম্পিটিশন অ্যান্ড কনজিউমার কমিশন অব সিঙ্গাপুর’ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন-ইইউভুক্ত দেশগুলোর যৌথ বাজারের সুরক্ষায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিযোগিতা আইন কাজ করে এবং এটি ইউরোপিয়ান কমিশনের কোনো বৃহৎ বহুজাতিক কোম্পানিকে নিজস্ব আধিপত্যের অপব্যবহার থেকে বিরত রাখে। য্ক্তুরাষ্ট্রে ১৮৯০ সালে চালু হওয়া শারম্যান অ্যাক্ট বর্তমানে অ্যান্টিট্রাস্ট আইন নামে পরিচিত, যা বাজারের প্রতিযোগিতা রক্ষায় অত্যন্ত কঠোর।

শেয়ার করুন