এ বছরের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার প্রথম দিনেই ২৪ হাজার ৭৮৪ জন পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিল, যা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার বর্তমান অবস্থার একটি উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে। তবে এর চেয়েও বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, নিয়মিত শিক্ষার্থীদের প্রায় ৩৬ শতাংশ এবার পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে না। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দুই বছর আগে এসএসসি পাস করে প্রায় ১৫ লাখ শিক্ষার্থী একাদশ শ্রেণীতে ভর্তি হলেও এবার মাত্র সাড়ে ৯ লাখ শিক্ষার্থী ফরম পূরণ করেছে। অর্থাৎ, পরীক্ষার শুরুতেই প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ নিয়মিত শিক্ষার্থী শিক্ষাপ্রবাহ থেকে ঝরে পড়েছে।
পরীক্ষার হলের খালি বেঞ্চগুলো কেবল একজন শিক্ষার্থীর অনুপস্থিতি নয়, এটি একটি পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার এক নীরব সাক্ষী। যদিও বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে ভর্তি বৃদ্ধি, বই বিতরণ ও নারী শিক্ষার প্রসারের মতো সাফল্য নিয়ে গর্ব করে আসছে, কিন্তু এই বিপুল সংখ্যক অনুপস্থিতি প্রমাণ করে যে শিক্ষার্থী ধরে রাখার ক্ষেত্রে আমাদের ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল।
শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার কারণগুলো বহুমুখী। দারিদ্র্যের চাপে অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনা ছেড়ে কাজে যোগ দিতে বাধ্য হচ্ছে। এছাড়া বাল্যবিয়ে, পারিবারিক চাপ, সামাজিক নিরাপত্তার অভাব এবং প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারির ঘাটতিও বড় ভূমিকা রাখছে। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে, যা ভবিষ্যৎ শ্রমবাজার ও জাতীয় উৎপাদনশীলতার জন্য অশনিসংকেত। কলেজগুলো কেবল ভর্তি ও ফরম পূরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি ও তাদের ব্যক্তিগত অবস্থার ওপর পর্যবেক্ষণ রাখলে এই ঝরে পড়ার হার কমানো সম্ভব ছিল।
শিক্ষা প্রশাসনের নেতৃত্বের কাছে প্রত্যাশা ছিল শিক্ষার মানোন্নয়ন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। কিন্তু গভীর সংকট মোকাবেলায় সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনার পরিবর্তে অনেক সময় দায় এড়ানোর প্রবণতা দেখা যায়। শুধু পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ বা সিসিটিভি মনিটরিং দিয়ে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য সফল হয় না। যদি লাখ লাখ শিক্ষার্থী পরীক্ষার আগেই হারিয়ে যায়, তবে কেন্দ্রের শৃঙ্খলা যতই ভালো হোক, তা জাতীয় সক্ষমতা বাড়াতে পারবে না।
এখন প্রয়োজন শিক্ষার্থী ধরে রাখতে একটি জাতীয় পর্যায়ের নিরীক্ষা। এসএসসি থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ পর্যালোচনা করে ঝরে পড়ার কারণগুলো চিহ্নিত করতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ শিক্ষার্থীদের জন্য কাউন্সিলিং, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য আর্থিক সহায়তা এবং বাল্যবিয়ের শিকার শিক্ষার্থীদের জন্য স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি। শিক্ষা যদি কেবল সনদ উৎপাদনের যন্ত্রে পরিণত হয় এবং নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধ তৈরিতে ব্যর্থ হয়, তবে তা সমাজের ভিতকে দুর্বল করে দেয়। আজকের খালি বেঞ্চ আগামী দিনের অদক্ষ কর্মশক্তি ও হতাশ যুবসমাজের ইঙ্গিত দিচ্ছে, যা কাটিয়ে উঠতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।




