৬ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শাহজালাল বিমানবন্দরে লাগেজ চুরির ঘটনায় হাইকোর্টের নির্দেশে তদন্ত

প্রকাশ:

সৌদি প্রবাসী মনির হোসেন প্রবাসের কষ্টার্জিত অর্থে কেনাকাটা করে দেশে ফিরেছিলেন স্বজনদের জন্য। কিন্তু হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন শেষে বেল্ট থেকে লাগেজ সংগ্রহ করতে গিয়েই তার সব আনন্দ হতাশায় রূপ নেয়। ব্যাগ কাটা, চেইন খোলা এবং মালামাল উধাও হওয়ার ঘটনাটি কেবল মনিরের নয়, বরং অনেক প্রবাসীরই নিত্যদিনের অভিজ্ঞতা।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের তথ্য অনুযায়ী, এই সমস্যাটি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। কেবল ২০২৫ সালেই লাগেজ সংক্রান্ত ১ হাজার ৩৮৭টি অভিযোগ জমা পড়েছিল। এর মধ্যে ১ হাজার ৩৭২টি অভিযোগ নিষ্পত্তির দাবি করা হলেও প্রকৃতপক্ষে ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন মাত্র ১৫ জন যাত্রী। এছাড়া ২০২৬ সালের প্রথম কয়েক মাসে জমা পড়েছে আরও ৯২২টি অভিযোগ, যার মধ্যে ৯১৪টি নিষ্পত্তির দাবি করা হলেও এর তদন্তের স্বচ্ছতা ও প্রকৃত প্রতিকার নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে।

এই লাগেজ ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দুর্বল নজরদারি ও জবাবদিহির অভাবের বিষয়টি এখন হাইকোর্টের নির্দেশে গঠিত স্বাধীন তদন্ত কমিটি খতিয়ে দেখছে। সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী আবদুল্লাহ আল মামুনের (রাসেল) করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত গত ৯ জুলাই বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন মন্ত্রণালয়কে ১৫ দিনের মধ্যে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী ১০ আগস্ট ১১ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়।

কমিটির আহ্বায়ক ও বেবিচকের সদস্য (প্রশাসন) এস এম লাবলুর রহমানের সভাপতিত্বে ৩০ আগস্ট দ্বিতীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে যে, কমিটির সদস্যরা রোববার সকাল ১০টায় বিমানবন্দরে গিয়ে লাগেজ গ্রহণ, বাছাই, পরিবহন ও ডেলিভারি প্রক্রিয়া সরাসরি পর্যবেক্ষণ করবেন। কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সাধারণ সম্পাদক ও কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট হুমায়ুন কবীর বলেন, কেবল মিটিং করে নয়, সরেজমিন পুরো প্রক্রিয়াটি পর্যবেক্ষণ করলেই অনিয়মের উৎস শনাক্ত করা সম্ভব।

তদন্ত কমিটির নথিপত্রে উঠে এসেছে যে, অসাধু কর্মীরা কৌশলে সিসিটিভি ক্যামেরার বাইরে নিয়ে লাগেজ থেকে মূল্যবান জিনিস চুরি করে। যদিও গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কর্মীদের নজরদারিতে বডি ক্যামেরা চালু করা হয়েছে, তবুও অভিযোগ কমছে না। কমিটি বডি ক্যামেরা ব্যবহারের আগের ও পরের পরিসংখ্যান এবং ফুটেজ সংরক্ষণের বিষয়টি যাচাই করতে চায়। এছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ মালামালের ১১৫টি অভিযোগের মধ্যে ১১৩টি নিষ্পত্তি এবং ৮টি ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ প্রদানের তথ্য পাওয়া গেছে, যা নিয়েও বিশ্লেষণ প্রয়োজন বলে মনে করছে কমিটি। ইতিমধ্যে অনিয়মের দায়ে ইউএস-বাংলার ২ জন ও বিমান বাংলাদেশের ১ জনসহ ৩ কর্মীকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলমের মতে, অভিযোগের ফাইল বন্ধ করা আর যাত্রীকে প্রকৃত প্রতিকার দেওয়া এক বিষয় নয়। হাজার হাজার অভিযোগের বিপরীতে হাতেগোনা ক্ষতিপূরণের হার পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। বিমানবন্দরের নিরাপত্তা বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, সিসিটিভি নজরদারির বাইরে লাগেজ সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হলে পুরো নিরাপত্তাব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

শেয়ার করুন