ফুটবলীয় অঙ্গনে বর্তমানে পৃথিবী যেন মেসিময়। ৩৯ বছর বয়সে এসেও লিওনেল মেসি যেভাবে সবুজ গালিচায় নিজের বুদ্ধিমত্তা ও জাদুকরী পারফরম্যান্স প্রদর্শন করছেন, তা পুরো বিশ্বকে অবাক করে দিচ্ছে। রোজারিও থেকে উঠে আসা সেই ছেলেটি, যার শৈশবের স্বপ্ন হরমোনজনিত রোগের কারণে বাধাগ্রস্ত হয়েছিল, তিনি আজ তার ষষ্ঠ বিশ্বকাপের আসরে দাঁড়িয়ে ফুটবলীয় ঐশ্বর্যের নতুন গল্প লিখছেন। তার ফুটবল-যৌবন হয়তো আগের মতো নেই, কিন্তু অসাধারণ ফুটবলীয় বুদ্ধিমত্তা তাকে এই খেলায় অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
বিশ্বকাপের দ্বিতীয় সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তার প্রভাব ছিল স্পষ্ট। আটলান্টায় ইংল্যান্ডের ১-০ গোলের লিডের সময় যখন সবাই আর্জেন্টিনার বিদায়ের আশঙ্কা করছিল, তখন মেসি মাঠের আসল নিয়ন্ত্রক হিসেবে আবির্ভূত হন। ৮৫ ও ৯২ মিনিটে তার দুটি জাদুকরী অ্যাসিস্ট থেকে এনজো ফার্নান্দেজ ও লাওতারো মার্তিনেজ গোল করে আর্জেন্টিনাকে জয়ের বন্দরে পৌঁছে দেন। এই জয়ে লন্ডন স্তব্ধ হলেও বুয়েনস এইরেসে নেমে আসে উৎসবের আমেজ। ১৯৬৬ সাল থেকে শিরোপার অপেক্ষায় থাকা ইংল্যান্ডের স্বপ্ন আরও একবার ধূলিসাৎ হলো মেসির নৈপুণ্যে।
ম্যাচটিতে ৯০ মিনিটে মেসি ৯৪ বার বল স্পর্শ করেছেন। তার নামের পাশে ৯টি সফল ড্রিবল, ৪টি সুযোগ তৈরি এবং ২টি ম্যাচজয়ী অ্যাসিস্ট যুক্ত হয়েছে। সেমিফাইনাল পর্যন্ত সাত ম্যাচে তিনি ৩৩টি শট নিয়েছেন ও ২১টি গোল করার সুযোগ তৈরি করেছেন। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত মেসির মোট অ্যাসিস্টের সংখ্যা ১২টি, যা তাকে তার পূর্বসূরি দিয়েগো ম্যারাডোনার (৮টি অ্যাসিস্ট) চেয়ে চার ধাপ এগিয়ে দিয়েছে।
মেসির শৈশবের আইডল পাবলো আইমার বলেছিলেন, ‘দ্য লাস্ট মেসি ইজ অলওয়েজ দ্য বেস্ট মেসি।’ ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে শিরোপা জয় তার ক্যারিয়ারকে পূর্ণতা দিয়েছিল। এবার ২০২৬ সালে আবারও মুকুট জয় করতে পারলে তা ম্যারাডোনার প্রতি উৎসর্গ করা এক অনন্য মাইলফলক হয়ে থাকবে। মেসির এই সাফল্যের পেছনে তার দাদির অনুপ্রেরণার কথা বারবার উঠে আসে, যিনি ছোটবেলায় তাকে সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো ফুটবল মাঠে আছড়ে পড়ার শিক্ষা দিয়েছিলেন। রবিবারের ফাইনালে মেটলাইফ স্টেডিয়ামে স্পেনের বিপক্ষে মেসি তার সেই চিরচেনা ঢেউয়ের দাপট দেখাবেন কি না, তা নিয়ে এখন ফুটবলপ্রেমীদের মাঝে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
এও এক জাদু যে, এই বিশ্বকাপে মেসি দৌড়াচ্ছেন কম, সুযোগ তৈরি করছেন বেশি। আটটি গোল এবং চারটি অ্যাসিস্ট। সেমিফাইনাল পর্যন্ত সাত ম্যাচে জাদুকর ৩৩টি শট নিয়েছেন। সুযোগ তৈরি করে দিয়েছেন ২১টি। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে ম্যারাডোনার অবদান ছিল এরচেয়ে কম। আরেকটি আশ্চর্যের বিষয়, মেসি মাঠে যেন হাঁটছেন। কিন্তু বল তার পায়ে গেলে বিদ্যুতায়িত হয়ে যান তিনি। দর্শকরা চোখের পলক ফেলেন না। যদি কোনো হিরণ্ময় মুহূর্ত মিস হয়ে যায়। গোটা পৃথিবী তখন বদলে যায়। চাঁদ ফিসফিস করে জ্যোৎস্নাকে বলে, নাচ তো একটু। মেসি এখন ম্যাজিক দেখাবে।





