ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যেখানে সন্তানকে কেবল পরিবারের সদস্য হিসেবে নয়, বরং মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে মা-বাবার কাছে অর্পিত পবিত্র আমানত হিসেবে দেখা হয়। পবিত্র কোরআনে সন্তানকে পিতা-মাতার জন্য পার্থিব শোভা ও পরীক্ষার মাধ্যম হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। ফলে শিশুর শারীরিক, মানসিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক বিকাশের দায়িত্ব কেবল আবেগের বিষয় নয়, বরং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে ইসলাম একদিকে যেমন স্নেহ, ভালোবাসা ও দয়ার শিক্ষা দেয়, অন্যদিকে প্রয়োজনে সীমিত ও ন্যায়সংগত শাসনের অনুমতিও প্রদান করে।
শিশুদের প্রতি আচরণের ক্ষেত্রে মহানবী (সা.) ছিলেন সর্বোত্তম আদর্শ। তিনি শিশুদের ভালোবাসতেন, কোলে তুলে নিতেন, মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে দিতেন এবং হাসিমুখে আন্তরিকতার সাথে কথা বলতেন। এমনকি চলার পথে শিশুদের আগে সালাম দেওয়ার ঘটনাও হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। হজরত হাসান (রা.) ও হোসেন (রা.)-কে চুম্বন করার সময় এক সাহাবির বিস্ময়ের জবাবে মহানবী (সা.) বলেছিলেন, ‘যার অন্তরে দয়া নেই, তার প্রতিও দয়া দেখানো হয় না।’ নামাজরত অবস্থায় নাতনি উম্মে কুলসুমকে কাঁধে নিয়ে সালাত আদায়ের ঘটনা তার অসীম সহনশীলতার প্রমাণ। তিরমিজি শরিফের ১৯২১ নম্বর হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে আমাদের ছোটদের স্নেহ করে না এবং বড়দের সম্মান করে না, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।’
শিশুরা স্বভাবগতভাবেই কৌতূহলী ও চঞ্চল, তাই ভুল করা তাদের স্বাভাবিক বিকাশের অংশ। ইসলামি চিন্তাবিদদের মতে, ভুলের জন্য কঠোরতা না দেখিয়ে ধৈর্য ও উৎসাহের সাথে বোঝানোই প্রকৃত শিক্ষা। ভয়ের পরিবেশে বেড়ে ওঠা শিশুরা মানসিকভাবে দুর্বল ও আত্মবিশ্বাসহীন হয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। তবে ইসলাম শাসনের প্রয়োজনীয়তাও অস্বীকার করে না। আবু দাউদ শরিফের ৪৯৫ নম্বর হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের সন্তানদের সাত বছর বয়সে নামাজের নির্দেশ দাও এবং দশ বছর বয়সে নামাজ না পড়লে তাদের শাসন করো।’ এই হাদিসের লক্ষ্য নির্যাতন নয়, বরং দীর্ঘদিনের শিক্ষার পরেও সংশোধনমূলক পদক্ষেপের অনুমতি দেওয়া।
ইসলামি বিশেষজ্ঞরা শাসনের ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে অগ্রসর হওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন। প্রথমে নরম ভাষায় উপদেশ, এরপর মৃদু তিরস্কার এবং শেষ পর্যায়ে সতর্ক করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। শাসনের উদ্দেশ্য হতে হবে সংশোধন, কোনোভাবেই কষ্টদায়ক বা ক্ষতিকর নয়। মুখমণ্ডল বা সংবেদনশীল স্থানে আঘাত করা, রাগের বশে প্রহার বা প্রকাশ্যে অপমান করা ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ফিকহবিদরা শারীরিক শাস্তির ক্ষেত্রেও আঘাতের মাত্রা ও স্থানের ওপর সুনির্দিষ্ট শর্ত আরোপ করেছেন, যেন তা প্রতিহিংসামূলক না হয়ে শিক্ষামূলক থাকে।
শিশুর ওপর জুলুম করা মারাত্মক গুনাহ, কারণ এটি বান্দার হকের সাথে সংশ্লিষ্ট। অভিভাবক বা শিক্ষকের প্রতিটি আচরণের মূলে থাকা উচিত সন্তানের কল্যাণ ও সঠিক পথে পরিচালনার আন্তরিক আকাঙ্ক্ষা। আজকের সমাজে শিশুদের মানসিক সুস্থতা ও পারিবারিক বন্ধন সুদৃঢ় করতে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণই একমাত্র পথ। স্নেহ হবে শিক্ষার ভিত্তি, দয়া হবে সম্পর্কের সৌন্দর্য এবং শাসন হবে প্রজ্ঞা ও সংযমের মাধ্যম, যা শিশুকে একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়তা করবে।





